ডিজিটাল সেবায় সার্ভার-পেমেন্ট জটিলতার অভিযোগ, প্রতিবাদে দুপুর ২টা পর্যন্ত কাজ বন্ধ
চট্টগ্রাম বন্দরের ডিজিটালাইজেশন ও অটোমেশন কার্যক্রম জোরদারের পরও ব্যবহারকারীদের হয়রানি ও ভোগান্তি কমছে না—এমন অভিযোগে বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) আন্দোলনে নামেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের কর্মসূচির কারণে দুপুর ২টা পর্যন্ত বন্দরের সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম বন্ধ ছিল বলে জানা গেছে। দীর্ঘদিনের হয়রানি, প্রশাসনিক জটিলতা এবং নতুন অনলাইন ব্যবস্থায় সার্ভার, পেমেন্ট কনফার্মেশন ও টোকেনসংক্রান্ত সমস্যার প্রতিবাদে এ কর্মসূচি পালন করা হয়।
বন্দর কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, ব্যবহারকারীদের সেবা সহজীকরণ, দ্রুত পণ্য খালাস, স্বচ্ছতা নিশ্চিত এবং বন্দর এলাকায় যানজট কমাতে ডিজিটালাইজেশন ও অটোমেশন কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে চট্টগ্রাম বন্দরকে সম্পূর্ণ পেপারলেস ও স্মার্ট পোর্টে রূপান্তরের লক্ষ্যেও কাজ চলছে। কিন্তু ব্যবহারকারীদের অভিযোগ, ডিজিটাল ব্যবস্থার পরিধি বাড়লেও বাস্তবে বিভিন্ন ধাপে নতুন করে কারিগরি জটিলতা তৈরি হচ্ছে। ফলে কাগজের কাজ কমলেও ভোগান্তি পুরোপুরি কমেনি।

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সম্প্রতি প্রকাশিত এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, বর্তমানে ১০০ শতাংশ ভেসেল বিল অনলাইনে সম্পাদিত হচ্ছে। কন্টেইনার ও কনসাইনি বিল শতভাগ টার্মিনাল অপারেটিং সিস্টেমের (TOS) মাধ্যমে তৈরি ও আদায়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নবনির্মিত ওয়ান-স্টপ সার্ভিস সেন্টারে সোনালী ব্যাংকের বুথ স্থাপন এবং API ইন্টিগ্রেশনের মাধ্যমে ছুটির দিন ও অফিস সময়ের বাইরেও অনলাইন পেমেন্ট সুবিধা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
একই সঙ্গে ই-গেট পাস ইস্যু ও গেটের প্রবেশ-বাহির কার্যক্রম শতভাগ অনলাইনের আওতায় আনা, TOS-এর মাধ্যমে টাইম স্লট ম্যানেজমেন্ট, অনলাইন কার্ট টিকিট, ই-গেট চালান এবং শতভাগ ভেসেল ই-এনওসি নিশ্চিত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ৭২ ঘণ্টার মধ্যে বন্দরের মাশুল পরিশোধ না হলে অটো পুল পেমেন্ট সিস্টেম, TOS-এ অনলাইন স্পেশাল ডেলিভারি অ্যাসাইনমেন্ট অনুমোদন এবং NBR/Customs-এর API ব্যবহারের মাধ্যমে অকশন ডেলিভারিসহ বিভিন্ন কার্যক্রম অনলাইনে আনার পরিকল্পনাও রয়েছে।
এ ছাড়া TOS-এর নতুন সংস্করণে ড্রপ টিকিট, পিকআপ টিকিট ও EIR ই-গেট পাসের সঙ্গে ইন্টিগ্রেশন করে যানজট কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ওয়ান-স্টপ সার্ভিস সেন্টারে রিয়েল-টাইম ডকুমেন্ট ভেরিফিকেশন, বিল জেনারেশন ও কনফার্মেশন, ICD ইন্টিগ্রেশন এবং বে টার্মিনালে স্লটভিত্তিক ট্রাক পার্কিং টিকিটিং ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনাও রয়েছে।
তবে মাঠপর্যায়ের চিত্র নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বন্দর ব্যবহারকারীরা। তাদের অভিযোগ, নতুন অটোমেশন ও অনলাইন ব্যবস্থা চালুর পরও ওয়ান-স্টপ সার্ভিস এবং পোর্ট বিল পেমেন্ট প্রক্রিয়ায় মাঝেমধ্যে সার্ভার জটিলতা দেখা দিচ্ছে। বিশেষ করে ব্যাংক ট্রানজেকশন কনফার্মেশন, টোকেন জেনারেশন এবং অনলাইন পেমেন্টের পরবর্তী ধাপে তথ্য আপডেট নিয়ে সমস্যায় পড়তে হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ইস্টার্ন ব্যাংক ও বিডি-আরটিজিএস সংযোগের মাধ্যমে পেমেন্ট প্রক্রিয়া আধুনিকায়নের উদ্যোগ নেওয়া হলেও ব্যবহারকারীদের একাংশের দাবি, সংযোগ বা সিস্টেমে সাময়িক সমস্যা দেখা দিলে পুরো কার্যক্রমের পরবর্তী ধাপ আটকে যাচ্ছে।
তাদের ভাষ্য, অনলাইনে পেমেন্ট করার পরও কোনো কোনো ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক কনফার্মেশন পাওয়া যাচ্ছে না। আবার টোকেন বা সংশ্লিষ্ট অনলাইন অনুমোদন পেতে বিলম্ব হলে পণ্য খালাসের পরবর্তী কার্যক্রমও থেমে যাচ্ছে। ফলে ডিজিটাল পদ্ধতিতে কাজ করার কথা থাকলেও সমস্যার সমাধানের জন্য সংশ্লিষ্টদের বারবার যোগাযোগ করতে হচ্ছে।
বন্দর ব্যবহারকারীদের আরও অভিযোগ, শুধু প্রযুক্তিগত সমস্যা নয়—দৈনন্দিন কাজের বিভিন্ন ধাপে তাদের হয়রানির মুখোমুখি হতে হচ্ছে। একটি কাজ শেষ করতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা, একাধিক পর্যায়ে যোগাযোগ এবং সিস্টেমের ত্রুটির কারণে সময়ক্ষেপণের অভিযোগ রয়েছে। কাজের সময়সীমা ধরে রাখতে অনেককে রাতদিন কাজ করতে হচ্ছে বলেও জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
তাদের প্রশ্ন, ডিজিটালাইজেশনের মূল উদ্দেশ্য যদি হয় সময়, খরচ ও শ্রম কমানো, তাহলে সিস্টেমের জটিলতার কারণে কেন ব্যবহারকারীদের অতিরিক্ত সময় দিতে হবে? অনলাইনে পেমেন্ট করার পর সিস্টেমে তথ্য আপডেট না হলে বা সার্ভার সমস্যায় কার্যক্রম বন্ধ থাকলে এর দায়ভার কার—এ বিষয়েও স্পষ্ট ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন বলে মনে করছেন তারা।
আজকের আন্দোলনকে দীর্ঘদিনের এসব অভিযোগেরই বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের দাবি, বন্দর কর্তৃপক্ষের ডিজিটালাইজেশন বা অটোমেশনের উদ্যোগে তাদের আপত্তি নেই। বরং তারা চান দ্রুত, স্বচ্ছ ও হয়রানিমুক্ত সেবা। কিন্তু প্রযুক্তিগত সমস্যার কারণে যেন নতুন করে কোনো ব্যবহারকারীকে হয়রানির শিকার হতে না হয়, সেটিই তাদের প্রধান দাবি।
অন্যদিকে বন্দর কর্তৃপক্ষের প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, অটোমেশন ও ডিজিটালাইজেশনের ফলে সময় ও খরচ সাশ্রয়ের পাশাপাশি দ্রুত বকেয়া আদায়সহ বিভিন্ন আর্থিক সুবিধা নিশ্চিত হচ্ছে। বন্দরের সব ব্যবহারকারী ও স্টেকহোল্ডারকে ডিজিটাল কার্যক্রমে সহযোগিতার আহ্বানও জানানো হয়েছে।
এখন মূল চ্যালেঞ্জ হচ্ছে ঘোষিত ডিজিটাল সেবাগুলোকে মাঠপর্যায়ে কতটা নিরবচ্ছিন্ন করা যায়। কারণ একটি স্মার্ট বন্দরের সাফল্য শুধু কতটি সেবা অনলাইনে নেওয়া হয়েছে, তা দিয়ে পরিমাপ করা সম্ভব নয়। সার্ভার কতক্ষণ সচল থাকে, পেমেন্ট কত দ্রুত কনফার্ম হয়, টোকেন পেতে কত সময় লাগে, একটি অভিযোগ কত দ্রুত নিষ্পত্তি হয় এবং প্রযুক্তিগত সমস্যার কারণে কোনো পণ্য বা চালান আটকে থাকলে তার সমাধান কত দ্রুত হয়—এসব বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষ করে চট্টগ্রাম বন্দর দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হওয়ায় এখানকার একটি সিস্টেমে সাময়িক জটিলতার প্রভাবও বিস্তৃত হতে পারে। একটি অনলাইন পেমেন্টের কনফার্মেশন বিলম্ব, একটি টোকেন জটিলতা কিংবা TOS-এর কোনো মডিউল সাময়িকভাবে অকার্যকর হয়ে পড়লে তার প্রভাব পড়তে পারে পণ্য খালাস, পরিবহন ও সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়িক কার্যক্রমে।
তাই ব্যবহারকারীদের হয়রানি বন্ধের পাশাপাশি ২৪ ঘণ্টার কার্যকর কারিগরি সহায়তা, দ্রুত সার্ভার সমস্যার সমাধান, ব্যাংক ও বন্দরের সফটওয়্যারের নিরবচ্ছিন্ন সংযোগ, পেমেন্ট কনফার্মেশনের তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা এবং অভিযোগ নিষ্পত্তির নির্দিষ্ট সময়সীমা নিশ্চিত করার দাবি জোরালো হচ্ছে।
চট্টগ্রাম বন্দরকে আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে সম্পূর্ণ পেপারলেস ও স্মার্ট পোর্টে রূপান্তরের যে লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে, তা বাস্তবায়নে প্রযুক্তির পাশাপাশি ব্যবহারকারীর অভিজ্ঞতাকেও গুরুত্ব দেওয়ার দাবি উঠেছে। কারণ ডিজিটাল পদ্ধতি চালু করাই শেষ কথা নয়—ডিজিটাল সেবায় হয়রানি ও ভোগান্তি বন্ধ করাই হবে স্মার্ট পোর্ট বাস্তবায়নের প্রকৃত পরীক্ষা।