ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে চলাচলকারী দূরপাল্লার বাস সার্ভিসগুলোর বিরুদ্ধে যাত্রী হয়রানি, বেপরোয়া গতি ও প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের অভিযোগ যেন নিত্যদিনের ঘটনায় পরিণত হয়েছে। যাত্রীসেবার নামে চলছে চরম অব্যবস্থাপনা, আর ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন সাধারণ মানুষ।
সম্প্রতি চট্টগ্রামের দামপাড়া থেকে শ্যামলী এন.আর ট্রাভেলস্-এর একটি বাসে ৭০০ টাকা দিয়ে ঢাকার টিকিট কাটি। টিকিট কাটার আগে কাউন্টার ম্যানেজারকে স্পষ্ট করে বলেছিলাম, আমাকে গাবতলী নামিয়ে দিতে হবে। তিনি আশ্বস্ত করেছিলেন, বাস সরাসরি গাবতলী যাবে।
রাত সাড়ে ১১টার দিকে বাসটি ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। কিন্তু যাত্রা শুরুর কিছুক্ষণ পরই আতঙ্ক শুরু হয়। চালক এমন বেপরোয়া গতিতে বাস চালাচ্ছিলেন, যেন মহাসড়কে নয়, আকাশপথে বিমান চালাচ্ছেন। ওভারটেক করতে গিয়ে অন্তত দু’বার বড় দুর্ঘটনার আশঙ্কা তৈরি হয়। আল্লাহর রহমতে প্রাণে বেঁচে যাই।
মাঝরাতে কুমিল্লায় ২০ মিনিটের যাত্রাবিরতির পর আবার যাত্রা শুরু হয়। ভোর ৫টা ১৫ মিনিটে বাসটি ঢাকার ফকিরাপুলে এসে থামে। এরপর গাড়ির সহকারী হঠাৎ জানিয়ে দেন- বাস আর যাবে না, সবাই নেমে যান।
এ কথা শুনে যাত্রীদের মধ্যে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। শুরু হয় চালক ও সহকারীর সঙ্গে তর্ক-বিতর্ক। পরে তারা জানায়, কাউন্টারে বসে থাকতে হবে, পরে একটি ছোট বাস এসে গাবতলী পৌঁছে দেবে।
আমরা শ্যামলী এন.আর ট্রাভেলস্-এর কাউন্টারে গিয়ে দায়িত্বরত কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলি। তিনি জানান, ছোট বাস আসতে সকাল ৭টা পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। চাইলে অন্য ব্যবস্থায় চলে যাওয়ারও পরামর্শ দেন। অথচ যাত্রীদের দুর্ভোগের বিষয়ে তাদের মধ্যে কোনো দায়বদ্ধতা চোখে পড়েনি।
সবচেয়ে হতাশাজনক বিষয় ছিল—টিকিটে দেওয়া অভিযোগ নম্বর ও হটলাইনে একাধিকবার ফোন করেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়ে মোটরসাইকেলে করে গাবতলী যেতে হয়।
কাজ শেষে বিকেলে শাপলা চত্বরের কাছ থেকে সেঁজুতি ট্রাভেলস-এর একটি বাসে ৮০০ টাকা দিয়ে চট্টগ্রামের টিকিট কাটি। বিকেল সাড়ে ৫টায় বাস ছাড়লেও মাঝেমধ্যে এত ধীরগতিতে চলছিল যে মনে হচ্ছিল টেলাগাড়িতে যাত্রা করছি।
পরে কুমিল্লার নুরজাহান হোটেলে যাত্রাবিরতির পর আবার বাস চলতে শুরু করে। কিন্তু রাত প্রায় পৌনে ১১টার দিকে সীতাকুণ্ড এলাকায় পৌঁছালে হঠাৎ বিকট শব্দে বাসের চাকা বিস্ফোরিত হয়।
আতঙ্কে যাত্রীরা দিশেহারা হয়ে পড়েন। সৌভাগ্যক্রমে বড় কোনো দুর্ঘটনা ঘটেনি। এরপর দীর্ঘ সাড়ে তিন ঘণ্টা চেষ্টা চালিয়ে চাকা পরিবর্তন করা হয়। কিন্তু নতুন লাগানো চাকাতেও বাতাস কম ছিল। তখনও যাত্রীরা বারবার হটলাইন ও অভিযোগ নম্বরে যোগাযোগের চেষ্টা করলেও কোনো সাড়া মেলেনি।
প্রশ্ন হলো- দূরপাল্লার এসব বাস সার্ভিস কি সত্যিই যাত্রীসেবা দিচ্ছে, নাকি সাধারণ মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করছে? যাত্রীদের জীবনঝুঁকি, হয়রানি ও ভোগান্তির দায় কে নেবে? এসব অনিয়ম দেখার জন্য কি কোনো কার্যকর তদারকি সংস্থা নেই?
সাধারণ যাত্রীরা আর কতদিন এভাবে অবহেলা ও দুর্ভোগের শিকার হবেন—সেই প্রশ্ন আজ সবার মুখে।