সাম্প্রতিক ভয়াবহ বন্যায় শুধু ঘরবাড়ি ও কৃষিখাত নয়, মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়েছে দক্ষিণ চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী চরকা শিল্পও। চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলার সামিয়ারপাড়া এলাকার প্রায় ৫৪ বছরের পুরোনো এই কুটির শিল্পে কর্মরত শত শত পরিবার এখন চরম আর্থিক সংকটে দিন কাটাচ্ছে। উদ্যোক্তাদের দাবি, বন্যার কারণে উৎপাদন কেন্দ্র, কাঁচামাল ও প্রস্তুত পণ্য নষ্ট হয়ে শিল্পটিতে কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ১৯৭২ সালে সাতকানিয়ার সামিয়ারপাড়ায় গড়ে ওঠে এই চরকা শিল্প। দক্ষিণ চট্টগ্রামে বাণিজ্যিকভাবে চরকার মাধ্যমে সুতা ও বিভিন্ন ধরনের জাল তৈরির একমাত্র কেন্দ্র এটি। বর্তমানে নারী-পুরুষ মিলিয়ে প্রায় ৭৫০টি পরিবার প্রত্যক্ষভাবে এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত।
শিল্প সংশ্লিষ্টরা জানান, বাইরে থেকে আমদানি করা চিকন সুতা চরকার মাধ্যমে প্রক্রিয়াজাত করে মোটা সুতা ও বিভিন্ন ধরনের জাল তৈরি করা হয়। এসব পণ্য দেশের মৎস্য ও কৃষিখাতে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। উৎপাদিত সুতা ও জাল ঢাকা, খুলনা, বরিশাল, চট্টগ্রামের চাক্তাই, বাঁশখালী, কক্সবাজার, ফেনী ও টেকনাফসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ব্যবসায়ীদের কাছে সরবরাহ করা হয়।
চরকা শ্রমিকরা বলেন, বন্যার পানিতে সব সুতা ও কাঁচামাল নষ্ট হয়ে গেছে। এখন কাজ নেই, আয়ও নেই। পরিবার নিয়ে মানবেতর জীবন কাটছে। সরকারি বা বেসরকারি কোনো সহায়তাও এখন পর্যন্ত পাননি বলে অভিযোগ তাদের।
শিল্প সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, প্রতি কেজি সুতা ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকায় বিক্রি হলেও উৎপাদন ব্যয় পড়ে ২২০ থেকে ২৫০ টাকা। শ্রমিকরা প্রতি কেজিতে ৪০ থেকে ৮০ টাকা মজুরি পান এবং একজন শ্রমিক দৈনিক গড়ে ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা আয় করেন। তবে বর্ষা মৌসুমে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় প্রতিবছরই নানা সংকটে পড়তে হয়। এবারের বন্যায় সেই সংকট আরও গভীর হয়েছে।
সামিয়ারপাড়া চরকা শিল্পের সভাপতি মঞ্জুর আলম বলেন, “এবারের বন্যায় চরকা শিল্পে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। প্রায় ৭৫০টি পরিবার আয়-রোজগার হারিয়ে অনাহার-অর্ধাহারে দিন কাটাচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিক ও উদ্যোক্তাদের টিকিয়ে রাখতে জরুরি আর্থিক সহায়তা ও পুনর্বাসন প্রয়োজন।”
এ বিষয়ে সাতকানিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা খোন্দকার মাহমুদুল হাসান বলেন, “বন্যায় চরকা শিল্পের প্রায় ৩০০টি পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তর কাজ করছে। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে কুটির শিল্প সংশ্লিষ্ট সংস্থার মাধ্যমে প্রয়োজনীয় সহায়তার ব্যবস্থা করার চেষ্টা করা হবে।”
স্থানীয়দের মতে, প্রায় পাঁচ দশকের ঐতিহ্য বহনকারী এই চরকা শিল্প শুধু একটি কুটির শিল্প নয়, এটি শত শত পরিবারের জীবিকার প্রধান অবলম্বন। তাই শিল্পটিকে টিকিয়ে রাখতে দ্রুত সরকারি সহায়তা, সহজ ঋণ ও পুনর্বাসন কর্মসূচি গ্রহণের বিকল্প নেই।