মডেল ও অভিনেত্রী আতিকা আফসানা আবারও ফিরছেন নিয়মিত অভিনয়ে। ২০২০ সালে ফটোশুটের মাধ্যমে শোবিজে যাত্রা শুরু করা এই অভিনেত্রী পরবর্তী সময়ে নাটক ও ধারাবাহিকে অভিনয়ের মাধ্যমে নিজের পরিচিতি তৈরি করেন। তবে ক্যারিয়ারের মাঝপথে পড়াশোনা, পরিবার ও ব্যক্তিজীবনে সময় দেওয়ার পাশাপাশি নিজেকে নতুনভাবে গড়ে তুলতে প্রায় দেড় বছর মিডিয়া থেকে দূরে ছিলেন তিনি।
বিরতি শেষে এখন নতুন উদ্যমে কাজে ফিরতে প্রস্তুত আতিকা। তবে এবার তার লক্ষ্য কাজের সংখ্যা বাড়ানো নয়; বরং ভালো গল্প, অর্থবহ ও চ্যালেঞ্জিং চরিত্রের মাধ্যমে দর্শকের মনে স্থায়ী জায়গা করে নেওয়া।

শোবিজে নিজের শুরুর দিনের স্মৃতিচারণ করে আতিকা আফসানা বলেন, শুরুর সময়টা ছিল রোমাঞ্চ ও কৌতূহলে ভরা। ক্যামেরার সামনে দাঁড়ানো, ফ্ল্যাশের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া কিংবা নিজেকে প্রথমবার পেশাদার ফ্রেমে দেখা—প্রতিটি অভিজ্ঞতাই ছিল নতুন। প্রতিটি শুটিং থেকেই নতুন কিছু শেখার সুযোগ পেয়েছেন তিনি। তার মতে, সেই অভিজ্ঞতাগুলোই পরবর্তী সময়ে নিজেকে গড়ে তোলার ভিত্তি তৈরি করেছে।
দীর্ঘ ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হিসেবে ধৈর্য ও আত্মবিশ্বাসকে গুরুত্ব দেন আতিকা। শোবিজে চড়াই-উতরাই থাকবেই উল্লেখ করে তিনি মনে করেন, নানা প্রতিকূলতা ও মন্তব্যের মধ্যেও নিজের লক্ষ্য ঠিক রেখে এগিয়ে যাওয়াই একজন শিল্পীর সবচেয়ে বড় শক্তি।
নাটক ও ধারাবাহিকে অভিনয়ের অভিজ্ঞতা নিয়েও সন্তুষ্ট এই অভিনেত্রী। তার কাছে প্রতিটি চরিত্রই গুরুত্বপূর্ণ। তবে মানুষের আবেগ, সংগ্রাম ও মনের জটিল দিকগুলো তুলে ধরার সুযোগ রয়েছে—এমন চরিত্রে অভিনয় করতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন তিনি। দর্শক যখন কোনো চরিত্রের সঙ্গে নিজেদের জীবনের মিল খুঁজে পান, সেটিকেই অভিনয়জীবনের বড় প্রাপ্তি বলে মনে করেন আতিকা।
ক্যারিয়ারের মাঝপথে দেড় বছরের বিরতির পেছনে ছিল ব্যক্তিগত ও একাডেমিক কারণ। আইন বিষয়ে পড়াশোনার পাশাপাশি পরিবার ও নিজের মানসিক শান্তিকে সময় দিতে চেয়েছেন তিনি। এই সময়টাকে অলসভাবে না কাটিয়ে নিজেকে মানসিকভাবে আরও শক্ত করার পাশাপাশি মানুষের আচরণ ও আবেগকে কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ করেছেন। একই সঙ্গে ফিটনেস ও অভিনয় দক্ষতা বাড়ানোর দিকেও নজর দিয়েছেন।
এখন কাজে ফেরার পর গল্প ও চরিত্রের মানকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে চান আতিকা। গল্পের গভীরতা, চরিত্রের গুরুত্ব এবং দর্শকের ওপর কাজটির সম্ভাব্য প্রভাব বিবেচনা করেই কাজ বেছে নিতে চান তিনি। বিশেষ করে চ্যালেঞ্জিং চরিত্রের প্রতি তার আগ্রহ বেশি।
ভবিষ্যতে সিনেমা ও ওটিটিতে কাজ করারও প্রবল আগ্রহ রয়েছে আতিকার। তার মতে, এসব মাধ্যমে চরিত্রের গভীরে যাওয়ার সুযোগ তুলনামূলক বেশি এবং গল্প বলার পরিসরও বিস্তৃত। ঐতিহাসিক বা জীবনীভিত্তিক শক্তিশালী চরিত্রের পাশাপাশি নারীকেন্দ্রিক থ্রিলার কিংবা তীব্র আবেগের গল্পে জটিল মানসিকতার চরিত্রে অভিনয় করার স্বপ্ন রয়েছে তার।
শোবিজে কাজ করতে গিয়ে কিছু কঠিন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হলেও সেগুলোকে শিক্ষা হিসেবে দেখেন আতিকা। এসব অভিজ্ঞতা তাকে আগের চেয়ে বাস্তববাদী ও মানসিকভাবে শক্ত করেছে বলে জানান তিনি। অন্ধভাবে সবাইকে বিশ্বাস না করে নিজের কাজ ও লক্ষ্যের প্রতি মনোযোগী থাকার শিক্ষাও পেয়েছেন এই সময় থেকে।
অভিনয়ের পাশাপাশি আইনজীবী হওয়ার স্বপ্নও দীর্ঘদিনের। ছোটবেলা থেকেই ন্যায়বিচার ও নিয়মের প্রতি আগ্রহ ছিল তার। তার বিশ্বাস, আইনের সঠিক প্রয়োগ মানুষের জীবন বদলে দিতে পারে। সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা ও বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা থেকেই আইন পেশার প্রতি তার আগ্রহ তৈরি হয়েছে।
আতিকা মনে করেন, অভিনয় ও আইন দুটি ভিন্ন জগত হলেও দুটিই তার জীবনে গুরুত্বপূর্ণ। অভিনয় তার আবেগ ও শিল্পীসত্তার জায়গা, আর আইন তার যুক্তি ও বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার ক্ষেত্র। সময় ব্যবস্থাপনা ও পরিকল্পনার মাধ্যমে ভবিষ্যতে দুটি ক্ষেত্রেই এগিয়ে যেতে চান তিনি।
নিজের জীবনের সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা হিসেবে মায়ের কথা উল্লেখ করেন আতিকা। মায়ের ধৈর্য, শক্তি ও নিঃশর্ত সমর্থন তাকে প্রতিকূলতার মধ্যেও এগিয়ে যেতে সাহস জুগিয়েছে বলে জানান তিনি।
ব্যক্তিজীবনে সাধারণভাবে থাকতেই পছন্দ করেন আতিকা। ক্যামেরার সামনে চরিত্রের প্রয়োজনে নানা রূপে হাজির হলেও বাস্তব জীবনে পরিবারকে সময় দেওয়া, নিজের মতো করে থাকা এবং মানসিক শান্তিকে গুরুত্ব দেন তিনি।
নতুন প্রজন্মের যারা অভিনয়ে আসতে চান, তাদের জন্য আতিকার পরামর্শ—শুধু গ্ল্যামারের পেছনে ছুটলে হবে না, অভিনয়ের দক্ষতা বাড়াতে হবে। নিয়মিত চর্চা ও ধৈর্যের মাধ্যমে নিজেকে তৈরি করতে হবে। রাতারাতি তারকা হওয়া সম্ভব হলেও একজন ভালো শিল্পী হয়ে উঠতে দীর্ঘদিনের সাধনা প্রয়োজন।
বিরতির পর ইতোমধ্যে কয়েকটি নতুন প্রজেক্ট নিয়ে আলোচনা চলছে বলে জানান আতিকা। খুব শিগগিরই নতুন কিছু কাজের মাধ্যমে দর্শকের সামনে হাজির হওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে তার। এবার আগের চেয়ে আরও পরিণত ও ভিন্নধর্মী চরিত্রে নিজেকে তুলে ধরতে চান এই অভিনেত্রী।
দশ বছর পর নিজেকে কোথায় দেখতে চান—এমন প্রশ্নে আতিকার স্বপ্ন আরও বিস্তৃত। একদিকে সফল ও মননশীল অভিনেত্রী হিসেবে দর্শকের হৃদয়ে জায়গা করে নিতে চান, অন্যদিকে দক্ষ আইনজীবী হিসেবে সমাজের জন্য কাজ করার স্বপ্নও দেখেন তিনি।
তার কাছে অভিনয় ও আইন পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, বরং পরিপূরক। অভিনয় তার শিল্পীসত্তাকে বাঁচিয়ে রাখবে, আর আইন তাকে যুক্তি ও ন্যায়বোধের জায়গা থেকে মানুষের জন্য কাজ করার সুযোগ দেবে। তাই নতুন করে পথচলা শুরু করা আতিকা আফসানার লক্ষ্য—দুই স্বপ্নকেই সমান গুরুত্ব দিয়ে এগিয়ে যাওয়া এবং ভালো কাজের মাধ্যমে দর্শকের মনে স্থায়ী জায়গা করে নেওয়া।