দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলায় নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটিতে জায়গা পেয়েছেন দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আহমেদ। দীর্ঘ সময় ধরে দলের সংকটকালীন মুহূর্তে সামনে থেকে নেতৃত্ব দেওয়া, নয়াপল্টনের কেন্দ্রীয় কার্যালয় থেকে নিয়মিত সংবাদ সম্মেলন ও বিবৃতির মাধ্যমে দলের অবস্থান তুলে ধরা এবং আন্দোলন-কর্মসূচির সমন্বয় করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন তিনি। এবার দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরামে অন্তর্ভুক্তির মধ্য দিয়ে তার দীর্ঘ রাজনৈতিক ভূমিকার আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি মিলল।
বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া গ্রেপ্তার হওয়ার পর দীর্ঘ সময় নয়াপল্টনের দলীয় কার্যালয়েই অবস্থান করে দলীয় কার্যক্রম পরিচালনা করেছিলেন রিজভী। দিনের পর দিন, মাসের পর মাস কার্যালয় থেকেই সংবাদ সম্মেলন করেছেন, গণমাধ্যমে দলীয় প্রেস রিলিজ পাঠিয়েছেন, কেন্দ্রীয় ও তৃণমূল নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ ও সমন্বয় করেছেন এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচির ঘোষণা দিয়েছেন। খালেদা জিয়া মুক্তি পাওয়ার পর তিনি কার্যালয় ছেড়ে বাসায় ফেরেন। বিএনপির কঠিন সেই সময়ে দলীয় কার্যালয়ই কার্যত তার বাসস্থানে পরিণত হয়েছিল।
শুধু একটি নির্দিষ্ট সময় নয়, দীর্ঘ প্রায় দেড় দশকের রাজনৈতিক সংকটেও রিজভী ছিলেন বিএনপির অন্যতম দৃশ্যমান মুখ। সরকারবিরোধী আন্দোলনের বিভিন্ন পর্যায়ে দলের অনেক নেতা গ্রেপ্তার, আত্মগোপন কিংবা রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যে থাকলেও নয়াপল্টন থেকে নিয়মিত দলের বক্তব্য গণমাধ্যমে তুলে ধরেছেন তিনি। রাজনৈতিক কর্মসূচি ঘোষণা থেকে শুরু করে কর্মীদের মাঠে নামার আহ্বান—দলের গুরুত্বপূর্ণ বার্তাগুলো মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে তার ভূমিকা ছিল ধারাবাহিক।
রাজনীতিতে রিজভীর এই ভূমিকার সঙ্গে জড়িয়ে আছে ব্যক্তিগত ত্যাগেরও নানা অধ্যায়। পরিবার-পরিজন থেকে দূরে থেকে দীর্ঘ সময় দলীয় কার্যালয়ে অবস্থান করা, রাজনৈতিক কর্মসূচিতে সক্রিয় থাকা এবং নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও দলের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাওয়া তার রাজনৈতিক জীবনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হয়ে উঠেছে। নয়াপল্টনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সঙ্গে তার দীর্ঘদিনের সম্পর্কের কারণে ওই কার্যালয়কে ঘিরে তার রাজনৈতিক জীবনের অসংখ্য স্মৃতি ও সংগ্রামের গল্প তৈরি হয়েছে।
রিজভীর রাজনৈতিক জীবনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় তার শারীরিক সংগ্রাম। আশির দশকের মাঝামাঝি সময়ে একটি রাজনৈতিক আন্দোলনে নেতৃত্ব দিতে গিয়ে মিছিলে গুলিবিদ্ধ হন তিনি। একটি থ্রি নট থ্রি রাইফেলের গুলি তার পেটের বাঁ পাশ দিয়ে ঢুকে পিঠ দিয়ে বেরিয়ে যায় বলে তার রাজনৈতিক সহকর্মীদের বর্ণনায় জানা যায়। গুরুতর আহত হলেও সেবার প্রাণে বেঁচে যান তিনি। তবে ওই গুলির আঘাতে শরীরের ভেতরের কিছু নাড়ি ও লিগামেন্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এরপর থেকেই বাঁ পায়ে ভর দিয়ে স্বাভাবিকভাবে চলাফেরায় সমস্যা তৈরি হয়। দীর্ঘদিন ধরে তাকে লাঠিতে ভর দিয়ে চলতে দেখা যায়। রাজনৈতিক কর্মসূচি কিংবা সংবাদ সম্মেলন—শারীরিক এই সীমাবদ্ধতাও তাকে সক্রিয়তা থেকে দূরে রাখতে পারেনি।
ছাত্ররাজনীতির মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক জীবনে প্রবেশ করা রুহুল কবির রিজভী পরবর্তী সময়ে বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে উঠে আসেন। দীর্ঘ সময় ধরে দলের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড, প্রচার ও গণমাধ্যমে দলের বক্তব্য তুলে ধরার দায়িত্ব পালন করেন। বিএনপির বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামের সময় নিয়মিত সংবাদ সম্মেলন করে দলের অবস্থান ব্যাখ্যা করার কারণে তিনি দলটির অন্যতম পরিচিত মুখে পরিণত হন।
বিশেষ করে ২০১০-এর দশকের মাঝামাঝি থেকে বিএনপির ধারাবাহিক সরকারবিরোধী আন্দোলনে রিজভীর সক্রিয়তা আরও দৃশ্যমান হয়। দলীয় কার্যালয়ে অবস্থান করে তিনি নিয়মিত সংবাদ সম্মেলন করেছেন এবং বিভিন্ন কর্মসূচি সম্পর্কে গণমাধ্যমকে অবহিত করেছেন। রাজনৈতিক অস্থিরতা ও দলীয় নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তারের মধ্যেও তার এই ধারাবাহিক উপস্থিতি বিএনপির সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড সচল রাখতে ভূমিকা রাখে বলে দলটির নেতাকর্মীরা মনে করেন।
২০২৩ ও ২০২৪ সালের রাজনৈতিক আন্দোলন এবং নির্বাচনকেন্দ্রিক কর্মসূচির সময়ও রিজভী ছিলেন বিএনপির অন্যতম প্রধান মুখপাত্র। নিয়মিত সংবাদ সম্মেলন, বিবৃতি এবং কর্মসূচি ঘোষণার মাধ্যমে তিনি দলের রাজনৈতিক অবস্থান তুলে ধরেন। পরবর্তী সময়ে দলের বিভিন্ন সাংগঠনিক ও নির্বাচনকেন্দ্রিক দায়িত্বেও তাকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে দেখা যায়।
২০২৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটিতেও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পান রিজভী। দলের নির্বাচন পরিচালনার ক্ষেত্রে সমন্বয়কের ভূমিকা পালন করেন তিনি। নির্বাচনে নিজে প্রার্থী হওয়ার পরিবর্তে দলীয় সাংগঠনিক দায়িত্ব পালনে মনোযোগ দেওয়ার বিষয়টিও তখন রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনায় আসে।
দলের নেতাকর্মীদের অনেকে মনে করেন, সংকটকালীন সময়ে সামনে থেকে দায়িত্ব নেওয়া এবং ব্যক্তিগত রাজনৈতিক লাভের চেয়ে সাংগঠনিক স্বার্থকে গুরুত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে রিজভীর ভূমিকা আলাদা। দীর্ঘ সময় ধরে দলের কঠিন সময়ে সক্রিয় থাকার পাশাপাশি সুসময়েও সাংগঠনিক দায়িত্ব পালনে তার ধারাবাহিকতা বিএনপির ভেতরে তাকে আলাদা অবস্থান তৈরি করে দিয়েছে।
এবার সেই দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলার স্বীকৃতি হিসেবে বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন রুহুল কবির রিজভী। ১৫ আগস্ট বিএনপির পক্ষ থেকে জানানো হয়, রিজভীসহ চার নেতাকে দলের জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য করা হয়েছে। অন্য তিনজন হলেন আমান উল্লাহ আমান, ফরহাদ হালিম ডোনার ও ইসমাইল জবিউল্লাহ। নতুন চারজন যুক্ত হওয়ার ফলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৮ জনে।
দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরামে রিজভীর অন্তর্ভুক্তিকে তার দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ও সাংগঠনিক ভূমিকার স্বীকৃতি হিসেবে দেখছেন বিএনপির নেতাকর্মীরা। বিশেষ করে দীর্ঘ আন্দোলন, দলীয় সংকট, গণমাধ্যমে দলের বক্তব্য তুলে ধরা এবং সাংগঠনিক সমন্বয়ের অভিজ্ঞতা এখন দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে কাজে লাগবে বলে প্রত্যাশা করছেন তারা।
রাজনীতিতে সংকটের সময়ে যারা দলের পাশে থাকেন, তাদের অনেকেই সুসময় এলে দৃশ্যপটের আড়ালে চলে যান—আবার অনেকে সংকটকে রাজনৈতিক অবস্থান শক্ত করার সুযোগ হিসেবে নেন। রুহুল কবির রিজভীর দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলা অবশ্য সেই প্রচলিত ধারণার সঙ্গে পুরোপুরি মেলে না। দলের সবচেয়ে কঠিন সময়ে নয়াপল্টনের কার্যালয়কে নিজের ঠিকানা বানিয়ে কাজ করা থেকে শুরু করে আন্দোলন, সংবাদ সম্মেলন, সাংগঠনিক সমন্বয় এবং নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্ব—প্রতিটি পর্যায়েই তাকে সামনে দেখা গেছে।
স্থায়ী কমিটিতে অন্তর্ভুক্তির মধ্য দিয়ে রিজভীর রাজনৈতিক জীবনে নতুন দায়িত্বের সূচনা হলো। এখন দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরামে তার দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রাম ও সাংগঠনিক অভিজ্ঞতা কীভাবে কাজে লাগে, সেটিই হবে বিএনপির রাজনীতিতে তার নতুন অধ্যায়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক।