বিশ্বভ্রমণের দীর্ঘ অভিযাত্রায় নতুন ইতিহাস গড়েছেন বাংলাদেশের কৃতি অভিযাত্রী নাজমুন নাহার। গত ৭ আগস্ট ভুটান সফরের মধ্য দিয়ে তিনি ১৮৫তম দেশ ভ্রমণের মাইলফলক স্পর্শ করেছেন। লাল-সবুজ পতাকা হাতে বিশ্বের একের পর এক দেশ পাড়ি দিয়ে তাঁর এই অর্জন বাংলাদেশের জন্যও এনে দিয়েছে অনন্য গৌরব।
দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে একের পর এক দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছুটে চলেছেন নাজমুন। পাহাড়-পর্বত, মরুভূমি, সমুদ্র, দুর্গম সীমান্ত কিংবা অপরিচিত জনপদ—কোনো বাধাই তাঁর অভিযাত্রাকে থামাতে পারেনি। বিশেষ করে দীর্ঘ এই পথচলায় তিনি একা ভ্রমণকারী হিসেবে সড়কপথে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ঘুরে বাংলাদেশের পতাকা তুলে ধরেছেন।

নাজমুন নাহারের বিশ্বভ্রমণের শুরু ২০০০ সালে। ভারতের একটি আন্তর্জাতিক যুব ফোরামের কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার মধ্য দিয়ে তাঁর অভিযাত্রার সূচনা হয়। সেই যাত্রা পরবর্তীতে রূপ নেয় বিশ্বভ্রমণের স্বপ্নে। এরপর গত ২৬ বছরে তিনি পৃথিবীর বিভিন্ন মহাদেশের দেশগুলোতে পা রেখেছেন এবং প্রতিটি সফরে সঙ্গে নিয়েছেন বাংলাদেশের লাল-সবুজ পতাকা।
২০১৮ সালের ১ জুন জিম্বাবুয়ে ভ্রমণের মাধ্যমে নাজমুন নাহার ১০০তম দেশ ভ্রমণের মাইলফলক অর্জন করেন। এরপর ২০২১ সালের ৬ অক্টোবর সাও টোমে অ্যান্ড প্রিন্সিপেতে পা রেখে পূর্ণ করেন ১৫০টি দেশ। ২০২৪ সালে ভানুয়াতু সফরের মধ্য দিয়ে তাঁর ভ্রমণ তালিকা আরও সমৃদ্ধ হয়। পরে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে বাহামা সফরের মাধ্যমে তিনি পৌঁছান ১৮৪তম দেশে।
সবশেষ গত ৭ আগস্ট ভুটান সফরের মধ্য দিয়ে তাঁর ভ্রমণ তালিকায় যুক্ত হলো ১৮৫তম দেশ। হিমালয়ের কোলঘেঁষা ভুটানের পারো, থিম্পু, পুনাখা, দোচুলা ও হা ভ্যালিসহ বিভিন্ন এলাকায় বাংলাদেশের পতাকা হাতে ঘুরেছেন তিনি। দেশটির পাহাড়ি সৌন্দর্য, নির্মল পরিবেশ ও মানুষের জীবনযাত্রা তাঁকে মুগ্ধ করেছে বলে জানিয়েছেন নাজমুন।
তবে নাজমুনের কাছে বিশ্বভ্রমণ কেবল নতুন নতুন দেশ দেখা কিংবা ব্যক্তিগত অ্যাডভেঞ্চারের বিষয় নয়। তাঁর প্রতিটি সফরের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বাংলাদেশকে বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরার একটি লক্ষ্য। বিভিন্ন দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও জনসমাগমে তিনি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, ইতিহাস, সংস্কৃতি ও মানুষের অর্জনের কথা তুলে ধরেছেন।
বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে তিনি শান্তি, পরিবেশ রক্ষা ও সামাজিক সচেতনতার বার্তাও ছড়িয়ে দিয়েছেন। ‘নো ওয়ার, অনলি পিস’, ‘সেভ দ্য প্ল্যানেট’ এবং ‘স্টপ চাইল্ড ম্যারেজ’-এর মতো বার্তা নিয়ে কথা বলেছেন তিনি। বিশেষ করে তরুণদের স্বপ্ন দেখতে এবং সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে সাহসী হওয়ার আহ্বান জানিয়ে আসছেন এই অভিযাত্রী।
দীর্ঘ এই অভিযাত্রায় তাঁকে পাড়ি দিতে হয়েছে নানা প্রতিকূলতা। অপরিচিত পরিবেশ, দুর্গম পথ, সীমান্তের জটিলতা, ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক পার্থক্য এবং বিভিন্ন সময়ের নিরাপত্তা ঝুঁকি—সবকিছুকে মোকাবিলা করেই এগিয়ে গেছেন তিনি। একা ভ্রমণ করার কারণে অনেক সময় সিদ্ধান্ত নেওয়া থেকে শুরু করে পথের প্রতিটি ঝুঁকি তাঁকেই সামলাতে হয়েছে।
নাজমুন নাহারের এই অসাধারণ অভিযাত্রা বিভিন্ন সময় বিভিন্ন সম্মাননাও পেয়েছে। সর্বশেষ ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনস তাঁকে ‘ফ্ল্যাগ লরিয়েট অব ন্যাশনাল প্রাইড’ উপাধিতে ভূষিত করে। তাঁর দীর্ঘ বিশ্বভ্রমণ এবং বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের পতাকা তুলে ধরার উদ্যোগকে জাতীয় গৌরবের অংশ হিসেবে মূল্যায়ন করা হয়।
১৮৫ দেশ ভ্রমণের এই অর্জন তাই শুধু একজন নারীর ব্যক্তিগত সাফল্যের গল্প নয়; এটি বাংলাদেশের পতাকা বিশ্বজুড়ে তুলে ধরার এক দীর্ঘ অধ্যায়ের প্রতিচ্ছবি। ২৬ বছরের অভিযাত্রায় নাজমুন নাহারের হাতে ওড়া লাল-সবুজ পতাকা হয়ে উঠেছে সাহস, আত্মবিশ্বাস ও বাংলাদেশের পরিচয়ের প্রতীক।
দুর্গম পথের বাধা পেরিয়ে বিশ্বের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছুটে চলা নাজমুনের এই যাত্রা প্রমাণ করে—স্বপ্ন বড় হলে এবং সেই স্বপ্ন পূরণে দৃঢ়তা থাকলে সীমাবদ্ধতা কোনো বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে না। ১৮৫টি দেশের মাইলফলক পেরিয়ে তাঁর বিশ্বভ্রমণের গল্প এখন বাংলাদেশের নারী ও তরুণ প্রজন্মের জন্যও অনুপ্রেরণার এক অনন্য দৃষ্টান্ত।