দীর্ঘ প্রায় ৩০ বছরের পানির সংকটের অবসান ঘটতে যাচ্ছে চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (চুয়েট)। চট্টগ্রাম ওয়াসার কর্ণফুলী পানি শোধনাগার থেকে সরাসরি চুয়েট ক্যাম্পাসে সুপেয় পানি সরবরাহের লক্ষ্যে আট ইঞ্চি ব্যাসের বিতরণী পাইপলাইন স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) চুয়েট ক্যাম্পাসে এ প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, এমপি।
চট্টগ্রাম ওয়াসার এ উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে দীর্ঘদিন ধরে ভূ-গর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরশীল চুয়েটের পানি সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে বলে সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন। শুষ্ক মৌসুমে ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় যে সংকট তৈরি হয়, নতুন পাইপলাইন স্থাপনের মাধ্যমে তার স্থায়ী সমাধানের পথ তৈরি হবে।
চট্টগ্রাম ওয়াসা সূত্রে জানা গেছে, কর্ণফুলী পানি শোধনাগার-১ ও ২ থেকে বর্তমানে মহানগরীতে প্রতিদিন প্রায় ২৯ কোটি লিটার পানি সরবরাহ করা হচ্ছে। ওই পানি শোধনাগার থেকে চুয়েট পর্যন্ত নতুন বিতরণী পাইপলাইন স্থাপন করে পানি সরবরাহের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এর অংশ হিসেবে আট ইঞ্চি ব্যাসের পাইপলাইন স্থাপনের কাজ হাতে নিয়েছে চট্টগ্রাম ওয়াসা।
১৯৬৮ সালে রাউজানে প্রতিষ্ঠিত চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পাবলিক প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়। বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়টিতে পাঁচটি অনুষদের অধীনে ১৮টি বিভাগে প্রায় ৬ হাজার ৩৬৭ শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছেন। শিক্ষক রয়েছেন ৩৬১ জন এবং শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ মোট জনবল প্রায় ১ হাজার ৫৩ জন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছয়টি ছাত্র হল ও তিনটি ছাত্রী হলের পাশাপাশি শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের আবাসিক এলাকায় প্রায় ৬ হাজার ৫০০ মানুষের বসবাস রয়েছে।
এত বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী, শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও আবাসিক এলাকার বাসিন্দাদের পানির চাহিদা দীর্ঘদিন ধরে মূলত ভূ-গর্ভস্থ পানি উত্তোলনের মাধ্যমে পূরণ করা হয়ে আসছে। তবে ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর ক্রমাগত নিচে নেমে যাওয়ায় বিশেষ করে শুষ্ক মৌসুমে পানি উত্তোলন ও সরবরাহে সংকট তীব্র আকার ধারণ করে। এতে চুয়েটের স্বাভাবিক শিক্ষা ও আবাসিক কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হতো।
পানি সংকটের স্থায়ী সমাধানের লক্ষ্যে গত ১৫ জুন চট্টগ্রাম ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক বরাবর চুয়েট কর্তৃপক্ষ পানি সরবরাহের জন্য আবেদন করে। আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সামগ্রিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে চট্টগ্রাম ওয়াসা ৬ জুলাই বিআরটিসি, চুয়েটের কাছে বর্তমানে ব্যবহৃত পানির পরিমাণের ভিত্তিতে পাইপলাইন ডিজাইন, পাম্পের সক্ষমতা এবং পূর্ণাঙ্গ নকশাসহ সম্ভাব্য প্রাক্কলন প্রস্তুতের জন্য প্রয়োজনীয় কার্যক্রম গ্রহণ করে।
এরই ধারাবাহিকতায় কর্ণফুলী পানি শোধনাগার থেকে চুয়েট পর্যন্ত পাইপলাইন স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে ওয়াসার শোধিত পানি সরাসরি চুয়েট ক্যাম্পাসে পৌঁছাবে। এতে একদিকে ভূ-গর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা কমবে, অন্যদিকে ক্যাম্পাসের শিক্ষার্থী ও আবাসিক এলাকার বাসিন্দাদের নিরাপদ ও নিরবচ্ছিন্ন পানি সরবরাহ নিশ্চিত করার সুযোগ তৈরি হবে।
ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, চুয়েটের দীর্ঘদিনের পানি সমস্যা সমাধানে চট্টগ্রাম ওয়াসার উদ্যোগকে তিনি স্বাগত জানান। বর্তমান সরকার সবার জন্য সুপেয় পানি সরবরাহ নিশ্চিত করার উদ্যোগ নিয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, চুয়েটে পানি সরবরাহের কাজ সম্পন্ন হলে দীর্ঘদিনের সমস্যার অবসান হবে। একই সঙ্গে এ উদ্যোগ সরকারের জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডের ভাবমূর্তি আরও উজ্জ্বল করবে।
চট্টগ্রাম ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী সেলিম মোঃ জানে আলম বলেন, চুয়েট শুধু চট্টগ্রামের নয়, বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রকৌশল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা দেশ-বিদেশে বিভিন্ন ক্ষেত্রে সুনামের সঙ্গে কাজ করে দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করছেন। অথচ দীর্ঘ প্রায় ৩০ বছর ধরে প্রতিষ্ঠানটি পানির সমস্যায় ভুগছে।
তিনি বলেন, দায়িত্ব গ্রহণের পর চট্টগ্রাম ওয়াসার পক্ষ থেকে চুয়েটে সুপেয় পানি সরবরাহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দ্রুততম সময়ের মধ্যে পাইপলাইন স্থাপনসহ প্রয়োজনীয় কাজ শেষ করে চুয়েটে পানি সরবরাহ নিশ্চিত করার আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।
চট্টগ্রাম ওয়াসা ও চুয়েট কর্তৃপক্ষের এ উদ্যোগকে দীর্ঘদিনের একটি অবকাঠামোগত সমস্যার স্থায়ী সমাধানের গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। পাইপলাইন স্থাপন ও পানি সরবরাহ কার্যক্রম সম্পন্ন হলে চুয়েটের প্রায় সাড়ে ছয় হাজার বাসিন্দার পানির চাহিদা পূরণে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হবে বলে সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা।