চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলার ছদাহায় সম্ভাবনাময় কৃষিপণ্য হিসেবে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে বারোমাসি তরমুজ। মার্সালো, আস্তা ও ব্ল্যাকবেবিসহ বিভিন্ন জাতের তরমুজ চাষ করে লাভের মুখ দেখছেন স্থানীয় কৃষকেরা। স্বল্প সময়ে ফলন ও বাজারজাতের সুযোগ, ক্রেতাদের বাড়তি চাহিদা এবং ক্ষেত থেকেই পাইকারদের কাছে বিক্রির সুবিধা—সব মিলিয়ে এ চাষে আগ্রহ বাড়ছে কৃষকদের।
উপজেলার ছদাহা, খোর্দ্দ কেওচিয়া এলাকায় বর্তমানে প্রায় পাঁচ হেক্টর জমিতে বারোমাসি তরমুজের আবাদ হয়েছে। মাচা ও মালচিং পদ্ধতিতে চাষ করা এসব তরমুজ গাছ থেকে ঝুলছে সারি সারি ফল। বড় আকারের তরমুজের ভারে যাতে লতা থেকে ছিঁড়ে না পড়ে, সে জন্য নেটের ব্যাগ দিয়ে বেঁধে রাখা হয়েছে। এতে ফলের সুরক্ষা নিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি ক্ষেতের সৌন্দর্যও বেড়েছে।
গত ১০ অক্টোবর শনিবার ছদাহার তরমুজখেত ঘুরে দেখা যায়, কৃষকেরা পরিচর্যায় ব্যস্ত সময় পার করছেন। ক্ষেতজুড়ে ঝুলে থাকা বিভিন্ন জাতের তরমুজের সম্ভাব্য ফলন নিয়ে আশাবাদী তাঁরা। কৃষকদের প্রত্যাশা, আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে এসব তরমুজ বাজারজাত করা সম্ভব হবে।
স্থানীয় কৃষক আবুল কাশেম, জালাল আহমদ ও রহিমা আক্তার জানান, চলতি মৌসুমে তরমুজের ফলন ভালো হয়েছে। প্রতিটি তরমুজের ওজন দুই থেকে আট কেজি পর্যন্ত হচ্ছে। ফলের ওজনের কারণে যাতে মাচা থেকে ছিঁড়ে না পড়ে, সে জন্য নেটের ব্যাগ ব্যবহার করতে হচ্ছে। তাঁদের মতে, তুলনামূলক কম সময়ে ফসল ঘরে তোলা এবং ভালো দাম পাওয়ার সম্ভাবনা থাকায় বারোমাসি তরমুজ চাষ লাভজনক হয়ে উঠছে।
কৃষকেরা আরও জানান, বিভিন্ন এলাকার পাইকারি ব্যবসায়ীরা সরাসরি খেতে এসে তরমুজ কিনে নিয়ে যান। পরে এসব তরমুজ চট্টগ্রাম, ঢাকা, কক্সবাজারসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহ করা হয়। এতে কৃষকদের পরিবহন ও বাজারজাতকরণের বাড়তি ঝামেলা কমে আসে। ক্রেতাদের কাছে সুস্বাদু ও রসালো তরমুজের চাহিদা থাকায় বিক্রির ক্ষেত্রেও ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যাচ্ছে।
ছয় জাতের তরমুজ চাষ
ছদাহা এলাকায় মার্সালো, ব্ল্যাকবেবি, আস্তা, পাকিজা, গোল্ডেন ক্রাউন ও তৃপ্তি—এই ছয় জাতের বারোমাসি তরমুজ চাষ করা হচ্ছে। জাতভেদে এসব তরমুজের বৈশিষ্ট্য ও উৎপাদনকালেও রয়েছে কিছু পার্থক্য।
মার্সালো জাতটি উচ্চ ফলনশীল ও মিষ্টি স্বাদের। ব্ল্যাকবেবি আকারে তুলনামূলক ছোট এবং এর খোসা কালচে রঙের। আস্তা একটি হাইব্রিড জাত, যা রোগ প্রতিরোধক্ষমতার জন্য পরিচিত। পাকিজা দ্রুত বর্ধনশীল ও অধিক ফলনশীল। গোল্ডেন ক্রাউনের খোসা সোনালি হলুদ এবং শাঁস সুস্বাদু। অন্যদিকে তৃপ্তি জাতটি বর্ষাসহ বিভিন্ন মৌসুমে চাষের উপযোগী। এসব জাতের তরমুজ উৎপাদনে মাচা ও মালচিং পদ্ধতি ব্যবহার করছেন কৃষকেরা।
চার বছরে বেড়েছে চাষির সংখ্যা
উপজেলা উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা আইয়ুব আলী জানান, ছদাহা-খোর্দ্দ কেওচিয়া ব্লকে চট্টগ্রাম কৃষি উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় প্রায় পাঁচ হেক্টর জমিতে বারোমাসি তরমুজ চাষ করা হয়েছে। এ ব্লকে ১০ থেকে ১৫টি প্রদর্শনী বাস্তবায়ন করা হয়েছে। কৃষকদের উৎপাদন বাড়াতে মাঠপর্যায়ে নিয়মিত পরামর্শ ও সহযোগিতা দেওয়া হচ্ছে। ছুটির দিনেও কৃষকদের পাশে থেকে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়ার চেষ্টা করছেন কৃষি কর্মকর্তারা।
তিনি বলেন, ২০২১ সালে প্রথম একজন কৃষক বারোমাসি তরমুজ চাষ শুরু করেন। তাঁর সাফল্য দেখে অন্য কৃষকেরাও এ চাষে আগ্রহী হন। বর্তমানে প্রায় ১০ থেকে ১২ জন কৃষক এ পদ্ধতিতে তরমুজ উৎপাদন করছেন।
আইয়ুব আলী আরও জানান, মার্সালো, আস্তা ও ব্ল্যাকবেবি জাতের তরমুজের চারা রোপণ থেকে বাজারজাত পর্যন্ত সাধারণত প্রায় ৬৫ দিন সময় লাগে। পাকিজা জাতের ক্ষেত্রে সময় লাগে ৭০ থেকে ৮০ দিন। অন্যান্য জাতের ক্ষেত্রেও সাধারণত প্রায় ৬৫ দিনের মধ্যে ফল বাজারজাতের উপযোগী হয়। কৃষকেরা বছরে দুই দফায় এ তরমুজ চাষ করছেন।
*অন্যান্য ইউনিয়নেও সম্প্রসারণের উদ্যোগ
সাতকানিয়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. মনিরুজ্জামান জানান, ছদাহায় প্রায় পাঁচ হেক্টর জমিতে মার্সালো, আস্তা, ব্ল্যাকবেবিসহ বিভিন্ন জাতের তরমুজ আবাদ হয়েছে। আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে এসব তরমুজ বাজারজাত করা হবে বলে আশা করা হচ্ছে। ছদাহার পাশাপাশি ধর্মপুর ইউনিয়নে এক বিঘা জমিতে এবং চরতী ইউনিয়নে পরীক্ষামূলকভাবে বারোমাসি তরমুজ চাষের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, এনএফএলসিসি প্রকল্পের প্রদর্শনীর মাধ্যমে এ তরমুজ চাষের সূচনা হয়েছিল। চাষ লাভজনক হওয়ায় কৃষকেরা এখন নিজেরাই আগ্রহ নিয়ে উৎপাদন করছেন। উপজেলা কৃষি অফিস থেকে তাঁদের নিয়মিত পরামর্শ ও প্রযুক্তিগত সেবা দেওয়া হচ্ছে।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, উপযুক্ত কৃষি পরামর্শ, উন্নত চাষপদ্ধতি, মানসম্মত বীজ এবং বাজারজাতকরণের সুযোগ নিশ্চিত করা গেলে সাতকানিয়ায় বারোমাসি তরমুজের আবাদ আরও সম্প্রসারিত হবে। এতে কৃষকদের আয় বাড়ার পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এ তরমুজের সরবরাহ বৃদ্ধি পেতে পারে। ভবিষ্যতে উৎপাদন ও মানের ধারাবাহিকতা বজায় রেখে রপ্তানির বাজার তৈরির সম্ভাবনাও দেখছেন তাঁরা।