চট্টগ্রামের বহুল আলোচিত মাকসুদুল হক চৌধুরী হত্যা মামলার তদন্তে নতুন মোড় নিয়েছে। মামলার তদন্তে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে চট্টগ্রামের আলোচিত শীর্ষ সন্ত্রাসী মোবারক হোসেন ওরফে ইমন ওরফে ডেভিড ইমনসহ পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করেছে চট্টগ্রাম জেলা গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ। পরে গ্রেপ্তারদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ফটিকছড়ির কাঞ্চননগর এলাকা থেকে একটি বিদেশি পিস্তল, দুটি দেশীয় এলজি ও অন্যান্য দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে।
চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) এসব তথ্য জানানো হয়।
পুলিশ জানায়, গত ১৩ জুন চট্টগ্রামের পাহাড়তলী এলাকায় সংঘটিত বহুল আলোচিত মাকসুদুল হক চৌধুরী হত্যা মামলার রহস্য উদ্ঘাটনে শুরু থেকেই নিবিড় তদন্ত চালিয়ে আসছিল জেলা পুলিশ। ঘটনার পর ঘটনাস্থল ও আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ, প্রযুক্তিগত তথ্য বিশ্লেষণ এবং বিভিন্ন গোয়েন্দা তথ্য যাচাই করে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের পরিচয় শনাক্ত করা হয়।
তদন্তের ধারাবাহিকতায় গত ২২ জুলাই মামলার এজাহারভুক্ত আসামি মো. মিঠু ওরফে ধামা ইলিয়াছকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পরে আদালতের অনুমতি নিয়ে তাকে দুই দিনের পুলিশ রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদে তিনি সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক, অস্ত্রের মজুদ এবং চক্রের অন্যান্য সদস্যদের বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেন বলে জানিয়েছে পুলিশ।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, ধামা ইলিয়াছ কুখ্যাত সন্ত্রাসী রায়হানের ঘনিষ্ঠ সহযোগী। তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন থানায় হত্যা, অস্ত্র, চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন অভিযোগে মোট ২১টি মামলা রয়েছে। এর মধ্যে পাঁচটি হত্যা মামলা বলেও জানিয়েছে জেলা পুলিশ।
রিমান্ডে পাওয়া তথ্য এবং পরবর্তী গোয়েন্দা অনুসন্ধানের ভিত্তিতে চট্টগ্রাম জেলা ডিবি পুলিশ শীর্ষ সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তারে অভিযান জোরদার করে। এরই অংশ হিসেবে গত ২৯ জুলাই যশোর জেলার কোতোয়ালি থানার ঝুমঝুমপুর এলাকায় যশোর জেলা পুলিশের সহযোগিতায় বিশেষ অভিযান চালানো হয়। অভিযানে মোবারক হোসেন ওরফে ইমন ওরফে ডেভিড ইমনসহ চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
পুলিশের প্রাথমিক অনুসন্ধানে জানা গেছে, ডেভিড ইমন দীর্ঘদিন ধরে চট্টগ্রাম মহানগর, ফটিকছড়ি ও রাঙ্গুনিয়াসহ বিভিন্ন এলাকায় সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে আসছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তার বিরুদ্ধে চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ (সিএমপি) ও চট্টগ্রাম জেলার বিভিন্ন থানায় হত্যা, অস্ত্র, চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন গুরুতর অপরাধে মোট ১৩টি মামলা রয়েছে।
এ ছাড়া চট্টগ্রাম মহানগর, রাউজান ও রাঙ্গুনিয়া থানা এলাকায় সংঘটিত একাধিক হত্যাকাণ্ডে তার সম্পৃক্ততার বিষয়ে তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে বলেও জানিয়েছে জেলা পুলিশ।
গ্রেপ্তারের পর জিজ্ঞাসাবাদে আসামিরা তাদের ব্যবহৃত অস্ত্রের অবস্থান সম্পর্কে তথ্য দেন। পরে তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে বৃহস্পতিবার রাত আনুমানিক সাড়ে ৩টার দিকে ফটিকছড়ি থানার কাঞ্চননগর ইউনিয়নের মানিকপুর গ্রামের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের পাইট্রাল টিলাপাড়ায় অভিযান চালায় জেলা ডিবি পুলিশ।
অভিযানকালে ওই এলাকার মৃত আবুল হোসেনের একটি পরিত্যক্ত বসতবাড়ি থেকে একটি বিদেশি পিস্তল, দুটি দেশীয় এলজি এবং অন্যান্য দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার করা হয়।
গ্রেপ্তারদের বিরুদ্ধে অস্ত্র আইনে পৃথক মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
গ্রেপ্তার পাঁচজন হলেন—ঢাকার মতিঝিল এলাকার বাসিন্দা ও কুমিল্লার মনোহরগঞ্জের স্থায়ী বাসিন্দা মো. শামীম (২৮), চট্টগ্রামের রাউজানের কদলপুর এলাকার মো. মিঠু ওরফে ধামা ইলিয়াছ (৪৯), ফটিকছড়ির কাঞ্চননগর এলাকার মোবারক হোসেন ওরফে ইমন ওরফে ডেভিড ইমন (২৫), ঢাকার শ্যামপুর এলাকার আল ইসলাম আলিফ ওরফে তমাল (২৫) এবং নোয়াখালীর সোনাইমুড়ীর বাসিন্দা বর্তমানে ঢাকার যাত্রাবাড়ী এলাকায় বসবাসকারী মো. সাফায়েত হোসেন (২৪)।
চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ জানিয়েছে, গ্রেপ্তারদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে সন্ত্রাসী চক্রের আরও সদস্যকে শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের লক্ষ্যে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। একই সঙ্গে উদ্ধার হওয়া অস্ত্রের উৎস, সন্ত্রাসী নেটওয়ার্কের অর্থায়ন এবং চক্রটির বিস্তৃত কার্যক্রম সম্পর্কে তদন্ত চলছে।
জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সন্ত্রাস, অবৈধ অস্ত্র ও সংঘবদ্ধ অপরাধের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতিতে অভিযান অব্যাহত থাকবে। জনগণের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, এলাকায় শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং অপরাধীদের আইনের আওতায় আনতে ভবিষ্যতে গোয়েন্দাভিত্তিক অভিযান আরও জোরদার করা হবে।