দেশের মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক, কারিগরি ও মাদ্রাসা পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে শুরু হতে যাচ্ছে ‘প্রাইম মিনিস্টার্স গোল্ডকাপ জাতীয় ফুটবল প্রতিযোগিতা ২০২৬’। দেশের ৪০ হাজার ২৩১টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং প্রায় দেড় কোটি শিক্ষার্থীকে সম্পৃক্ত করে আয়োজিত এ প্রতিযোগিতাকে বাংলাদেশের ইতিহাসে অন্যতম বৃহৎ শিক্ষা-ভিত্তিক ক্রীড়া আয়োজন হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমানের প্রত্যক্ষ পৃষ্ঠপোষকতায় আগামী আগস্ট মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে প্রতিযোগিতাটি শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। বন্দরনগরী চট্টগ্রামের চট্টগ্রাম জেলা স্টেডিয়ামে বর্ণাঢ্য উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের মাধ্যমে প্রতিযোগিতার আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হবে। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে প্রতিযোগিতার শুভ উদ্বোধন করবেন।

বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবে আয়োজিত এক প্রেস ব্রিফিংয়ে এসব তথ্য জানানো হয়। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে আয়োজিত এ সংবাদ সম্মেলনে প্রতিযোগিতার লক্ষ্য, উদ্দেশ্য, অংশগ্রহণকারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা, বিভিন্ন পর্যায়ের সময়সূচি এবং উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের নানা দিক তুলে ধরা হয়।
এসময় ভূমি ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন, চট্টগ্রাম-৮ আসনের সংসদ সদস্য এরশাদ উল্লাহ, চট্টগ্রাম-৯ আসনের সংসদ সদস্য আবু সুফিয়ান, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব আবদুল খালেকসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও গণমাধ্যমকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।

প্রেস ব্রিফিংয়ে জানানো হয়, প্রতিযোগিতার উদ্বোধনের জন্য প্রধানমন্ত্রীকে আমন্ত্রণ জানানো হলে তিনি উদ্বোধনী অনুষ্ঠান চট্টগ্রামে আয়োজনের নির্দেশ দেন। তাঁর নির্দেশনার আলোকে চট্টগ্রাম জেলা স্টেডিয়ামে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।
প্রতিযোগিতাটি কেবল একটি ফুটবল টুর্নামেন্ট নয়; বরং দেশের শিক্ষার্থীদের খেলাধুলায় সম্পৃক্ত করা, তৃণমূল পর্যায় থেকে মেধাবী ফুটবলার খুঁজে বের করা এবং জাতীয় পর্যায়ের খেলোয়াড় তৈরির সুযোগ সৃষ্টির লক্ষ্যে এটি একটি বৃহৎ জাতীয় ক্রীড়া উদ্যোগ।
প্রতিযোগিতার মূল উদ্দেশ্যগুলোর মধ্যে রয়েছে—মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক বা সমমান পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে খেলাধুলার প্রসার ঘটানো, মেধাবী ফুটবলার নির্বাচন করে জাতীয় পর্যায়ের খেলোয়াড় তৈরির সুযোগ সৃষ্টি, শিক্ষার্থীদের মধ্যে নেতৃত্ব, শৃঙ্খলা, সৌহার্দ্য ও দলগত মনোভাব গড়ে তোলা এবং স্কুল-কলেজ ও সমমানের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত ফুটবল চর্চার পরিবেশ সৃষ্টি করা।
এ ছাড়া শিক্ষার্থীদের মাদক, সন্ত্রাস ও সামাজিক অবক্ষয় থেকে দূরে রেখে ইতিবাচক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করাও এ প্রতিযোগিতার অন্যতম লক্ষ্য।
আয়োজকদের মতে, দেশের ক্রীড়াঙ্গনকে আরও গতিশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক করার জাতীয় অঙ্গীকারের প্রতিফলন ঘটবে এ প্রতিযোগিতার মাধ্যমে। সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারে ক্রীড়ার উন্নয়ন, তৃণমূল পর্যায়ে খেলাধুলার প্রসার, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের সুদৃঢ় অবস্থান তৈরি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ‘ট্যালেন্ট হান্ট’ কার্যক্রম চালু, নারী ক্রীড়াবিদদের নিরাপত্তা ও সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি, স্পোর্টস ইকোনমি সম্প্রসারণ এবং যুবসমাজকে খেলাধুলার মাধ্যমে সুস্থ ও দক্ষ মানবসম্পদে পরিণত করার যে অঙ্গীকার করা হয়েছে—এই আয়োজন সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।
প্রতিযোগিতাটি মাধ্যমিক এবং উচ্চ মাধ্যমিক বা সমমান—এই দুই পর্যায়ে অনুষ্ঠিত হবে। উভয় পর্যায়ে বালক ও বালিকা দল অংশগ্রহণ করবে। মাধ্যমিক পর্যায়ের খেলা প্রধানমন্ত্রীর উদ্বোধনের মাধ্যমে সারাদেশে উপজেলা ও থানা পর্যায়ে একযোগে শুরু হবে। পরে পর্যায়ক্রমে জেলা, অঞ্চল বা বিভাগ এবং জাতীয় পর্যায়ে প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হবে।
অন্যদিকে, উচ্চ মাধ্যমিক বা সমমান পর্যায়ের খেলা আগামী ৬ অক্টোবর উপজেলা বা থানা পর্যায় থেকে শুরু হবে। এরপর জেলা, অঞ্চল বা বিভাগীয় পর্যায় অতিক্রম করে জাতীয় পর্যায়ে প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হবে।
এবারের প্রতিযোগিতায় দেশের মোট ৪০ হাজার ২৩১টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান অংশগ্রহণ করবে। এর মধ্যে রয়েছে ১৯ হাজার ২১১টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়, ১ হাজার ৫৫৬টি স্কুল অ্যান্ড কলেজ, ৩ হাজার ৩৮০টি কলেজ, ৯ হাজার ২৯৬টি মাদ্রাসা এবং ৬ হাজার ৭৮৮টি কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান।
আয়োজকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, অংশগ্রহণকারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর শিক্ষার্থীর সংখ্যা ১ কোটি ৬০ লাখেরও বেশি। এত বিপুলসংখ্যক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণের মাধ্যমে এ প্রতিযোগিতা বাংলাদেশের ইতিহাসে অন্যতম বৃহত্তম শিক্ষা-ভিত্তিক ক্রীড়া আয়োজন হিসেবে পরিগণিত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
প্রতিযোগিতার সময়সূচি
মাধ্যমিক পর্যায়ে উপজেলা বা থানা পর্যায়ের খেলা আগামী ৯ আগস্ট থেকে ২০ আগস্ট পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হবে। এরপর জেলা পর্যায়ের খেলা ২৭ আগস্ট থেকে ৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হবে।
মাধ্যমিক পর্যায়ের অঞ্চল বা বিভাগীয় পর্যায়ের খেলা ২২ অক্টোবর থেকে ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত এবং জাতীয় পর্যায়ের খেলা ২৭ অক্টোবর থেকে ৩০ অক্টোবর পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হবে।
উচ্চ মাধ্যমিক বা সমমান পর্যায়ে উপজেলা বা থানা পর্যায়ের খেলা ৬ অক্টোবর থেকে ১১ অক্টোবর পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হবে। জেলা পর্যায়ের খেলা ১৩ অক্টোবর থেকে ১৭ অক্টোবর পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
উচ্চ মাধ্যমিক বা সমমান পর্যায়ের অঞ্চল বা বিভাগীয় পর্যায়ের খেলা ২২ অক্টোবর থেকে ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত এবং জাতীয় পর্যায়ের খেলা ২৭ অক্টোবর থেকে ৩০ অক্টোবর পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হবে।
উপজেলা বা থানা পর্যায় থেকে শুরু করে প্রতিটি পর্যায়ে চ্যাম্পিয়ন দল পরবর্তী ধাপে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে। সব ধাপ অতিক্রম করে বিজয়ী দলগুলো জাতীয় পর্যায়ের খেলায় অংশ নেবে।
মাধ্যমিক পর্যায়ে বালক ও বালিকা এবং উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে বালক ও বালিকা—এই চারটি ক্যাটাগরিতে দেশের আট অঞ্চল থেকে মোট ৩২টি দল জাতীয় পর্যায়ে অংশগ্রহণ করবে। জাতীয় পর্যায়ের প্রতিযোগিতা ঢাকায় অনুষ্ঠিত হবে।
মাধ্যমিক পর্যায়ে দুটি এবং উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে দুটি দলসহ মোট চারটি দল জাতীয় চ্যাম্পিয়নের শিরোপা অর্জন করবে।
আগামী অক্টোবর মাসের শেষ সপ্তাহে প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে ঢাকায় ফাইনাল খেলা ও সমাপনী অনুষ্ঠান আয়োজনের মধ্য দিয়ে এই বৃহৎ প্রতিযোগিতার পর্দা নামবে।
এদিকে, প্রতিযোগিতাকে কেন্দ্র করে সারাদেশে প্রস্তুতিমূলক কার্যক্রম শুরু হয়েছে। শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে রিলস, থিম সং ও মাসকট তৈরির প্রতিযোগিতারও আয়োজন করা হয়েছে। এসব প্রতিযোগিতায় সেরা নির্বাচিত শিক্ষার্থীদের হাতে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের দিন প্রধানমন্ত্রী পুরস্কার তুলে দেবেন বলে জানানো হয়।
প্রতিযোগিতা সফল করতে জনপ্রতিনিধি, সরকারের বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারী, ক্রীড়াবিদ, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দসহ সমাজের সব শ্রেণি-পেশার মানুষের সহযোগিতা কামনা করেছেন আয়োজকরা। বিশেষ করে উদ্বোধনী অনুষ্ঠান ও জাতীয় পর্যায়ের এই বৃহৎ আয়োজন সফল করতে ইলেক্ট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়ার সম্পাদক এবং সাংবাদিকদের সর্বাত্মক সহযোগিতা প্রত্যাশা করা হয়েছে।
প্রেস ব্রিফিংয়ে আরও বলা হয়, শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের স্মৃতিবিজড়িত চট্টগ্রাম মহানগরীতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে একটি স্মরণীয় ও বর্ণাঢ্য উদ্বোধনী অনুষ্ঠান উপহার দিতে প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছার যথাযথ মর্যাদা রেখে চট্টগ্রামে এ আয়োজন সফলভাবে সম্পন্ন করা হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন সংশ্লিষ্টরা।
আয়োজকদের বিশ্বাস, ‘প্রাইম মিনিস্টার্স গোল্ডকাপ জাতীয় ফুটবল প্রতিযোগিতা ২০২৬’ দক্ষ ফুটবলার তৈরির পাশাপাশি আত্মবিশ্বাসী, শৃঙ্খলাবদ্ধ ও দায়িত্বশীল নাগরিক গড়ে তুলতে ভূমিকা রাখবে। একই সঙ্গে দেশের ক্রীড়া সংস্কৃতিকে আরও সমৃদ্ধ, শক্তিশালী ও গতিশীল করবে এই বৃহৎ আয়োজন।