দি চিটাগাং কো-অপারেটিভ সোসাইটি লিমিটেডের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ও প্রশাসনিক জটিলতা নতুন মোড় নিয়েছে। গত ১৬ মে ২০২৬ তারিখে আহূত বার্ষিক সাধারণ সভা (এজিএম) স্থগিত হওয়ার পর এবার সোসাইটির সভাপতির ইতিপূর্বে গৃহীত ও ভবিষ্যতের সকল সাংগঠনিক এবং দাপ্তরিক কার্যক্রমের ওপরও “স্ট্যাটাস কো” তথা স্থিতাবস্থা জারি এবং নিষেধাজ্ঞা প্রদান করেছেন উচ্চ আদালত। আদালতের এই আদেশকে সংগঠনের গঠনতান্ত্রিক শৃঙ্খলা ও সদস্যদের অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন সাধারণ সদস্যদের বড় একটি অংশ।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, দীর্ঘদিন ধরে সোসাইটির কার্যনির্বাহী পরিষদের ভেতরে নানা অনিয়ম, একক সিদ্ধান্ত গ্রহণ, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং সাংগঠনিক শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগ নিয়ে বিরোধ চলে আসছিল। অভিযোগ রয়েছে, সোসাইটির সভাপতি জনাব ওয়াহেদ মালেক কার্যনির্বাহী কমিটির সভাগুলোতে জ্যেষ্ঠ সদস্যদের সঙ্গে অসদাচরণ, অশালীন ভাষা ব্যবহার এবং নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মতামত উপেক্ষা করে এককভাবে বিভিন্ন সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিতেন। একই সঙ্গে সাধারণ সম্পাদকের সাংগঠনিক ও দাপ্তরিক ক্ষমতায়ও হস্তক্ষেপের অভিযোগ ওঠে তাঁর বিরুদ্ধে।
সোসাইটির সাধারণ সম্পাদক মুহাম্মদ সাইফুদ্দিন বলেন, সমবায় সমিতির উপ-আইনের ১৬.০ অনুচ্ছেদের ৭ নম্বর ক্রমিক অনুযায়ী সাধারণ সম্পাদকের ওপর অর্পিত দায়িত্ব ও ক্ষমতা পালনে সভাপতি ধারাবাহিকভাবে বাধা সৃষ্টি করে আসছিলেন। তিনি অভিযোগ করেন, সভাপতি ওয়াহেদ মালেক সমবায় নীতিমালা ও সাংগঠনিক বিধি উপেক্ষা করে নিজের ক্ষমতা প্রয়োগের মাধ্যমে উদ্দেশ্যমূলকভাবে বিভিন্ন উপ-কমিটি গঠন করেন এবং গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণে অন্য সদস্যদের মতামতকে উপেক্ষা করেন।
তিনি আরও বলেন, “সাধারণ সম্পাদকের পরিবর্তে সভাপতি নিজেই বার্ষিক সাধারণ সভা আহ্বান করেন, যা সমবায় বিধির পরিপন্থী। এছাড়া নির্বাচিত সদস্যদের মতামতের ভিত্তিতে উপ-কমিটি গঠনের বিধান থাকলেও সভাপতি নিজের ক্ষমতাবলে ৮টি উপ-কমিটি ঘোষণা করেন। এর মধ্যে ‘জমি ক্রয় ও প্রকল্প বাস্তবায়ন’ উপ-কমিটিতে তিনি নিজেই আহ্বায়কের দায়িত্ব নেন, যা নৈতিকতা ও সুশাসনের প্রশ্ন তোলে।”
সাধারণ সম্পাদকের দাবি, মূল সোসাইটির সভাপতি হয়েও জমি ক্রয়ের মতো বৃহৎ আর্থিক কর্মকাণ্ড সংশ্লিষ্ট উপ-কমিটির আহ্বায়ক হিসেবে থাকা স্বার্থের সংঘাত সৃষ্টি করে এবং একক সিদ্ধান্তে অর্থ ব্যয়ের সুযোগ তৈরি করে। তিনি বলেন, “সমবায় সমিতির দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য, স্বচ্ছতা ও সদস্যদের স্বার্থ রক্ষার জন্যই আমরা আদালতের শরণাপন্ন হয়েছি।”
মামলার নথি সূত্রে জানা যায়, সোসাইটির সাধারণ সম্পাদক মুহাম্মদ সাইফুদ্দিন বাদী হয়ে সভাপতি ওয়াহেদ মালেকের বিরুদ্ধে চট্টগ্রামের ৩য় যুগ্ম জেলা জজ আদালতে অপর-৪৯/২০২৬ নম্বর মামলা দায়ের করেন। মামলায় বিবাদীর বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা ও অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ প্রার্থনা করা হয়। পরবর্তীতে চলতি বছরের ২৬ ফেব্রুয়ারি ১৫১ ধারায় একটি আবেদন করা হলেও তা নামঞ্জুর করেন নিম্ন আদালত।
পরে উক্ত আদেশের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে সিভিল রিভিশন নং-১২৫৫/২০২৬ দায়ের করা হয়। বিচারপতি এস এম কুদ্দুছ জামান এবং বিচারপতি তামান্না রহমান খালিদির সমন্বয়ে গঠিত দ্বৈত বেঞ্চে গত ১১ মে শুনানি শেষে রুল জারি করেন। একই সঙ্গে আদালত সভাপতির স্বাক্ষরিত পূর্ববর্তী সকল মিটিং, সিদ্ধান্ত ও কার্যক্রমের ওপর “স্ট্যাটাস কো” জারি করেন। পাশাপাশি ১৬ মে অনুষ্ঠিতব্য বার্ষিক সাধারণ সভাসহ সভাপতির স্বাক্ষরিত ও সম্পাদিত সকল কার্যক্রমের ওপর পরবর্তী এক বছরের জন্য নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়।
আদালতের এ আদেশের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর সোসাইটির সাধারণ সদস্যদের মধ্যে স্বস্তি ফিরে এসেছে বলে জানা গেছে। অনেক সদস্য মনে করছেন, দীর্ঘদিনের অচলাবস্থা ও অভ্যন্তরীণ বিরোধ নিরসনে আদালতের এই হস্তক্ষেপ সংগঠনের জবাবদিহিতা ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া পুনরুদ্ধারে সহায়ক ভূমিকা রাখবে। তবে এ বিষয়ে সভাপতির পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।