হালদা নদীর জেলেদের জীবনের কঠিন বাস্তবতা—“মাছ না মিললে ঘরে চালও জোটে না”—এই চিরচেনা সংকটের ভেতরেই এবার দেখা মিলল ভিন্ন এক সম্ভাবনার। চট্টগ্রামের রাউজানে হালদা পাড়ের জেলে পরিবারগুলোকে বিকল্প আয়ের পথে এগিয়ে নিতে সেলাই মেশিনসহ নানা সহায়তা বিতরণ করেছে জেলা প্রশাসন।
মঙ্গলবার (১৯ মে) রাউজান উপজেলা প্রশাসনের আয়োজনে ৭৫ জন জেলের হাতে সেলাই মেশিন, স্ট্যান্ড, চেয়ার ও ড্রাই আয়রন তুলে দেওয়া হয়। পাশাপাশি ১৫টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ৭৫ জন শিক্ষার্থীর জন্য শিক্ষা উপকরণ এবং সমাজসেবা অধিদপ্তরের ২১ জন উপকারভোগীর মাঝে ৫০ হাজার টাকা করে এককালীন আর্থিক সহায়তাও দেওয়া হয়।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন, প্রজন্মের পর প্রজন্ম একই পেশায় আটকে থাকলে জীবনমানের উন্নয়ন সম্ভব নয়। প্রযুক্তি ও সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বিকল্প কর্মসংস্থানের দিকে এগিয়ে যেতে হবে।
অনুষ্ঠানের বাস্তব চিত্রে দেখা যায়, জেলে পরিবারগুলোর মাঝে স্বস্তি ও আশার অনুভূতি ছড়িয়ে পড়ে। নতুন পাওয়া সেলাই মেশিনকে তারা শুধু একটি যন্ত্র হিসেবে নয়, বরং জীবিকার নতুন পথ হিসেবে দেখছেন।
মৃদুল বড়ুয়া নামের এক জেলে বলেন, “ডিসি স্যার আমাদের সেলাই মেশিন দিয়েছেন। আমার পরিবারের মেয়েরা এখন সেলাই শিখে ঘরে বসেই আয় করতে পারবে। এতে সংসারের চাপ কিছুটা কমবে।”
তার পুত্রবধূ শর্মিলা বড়ুয়া জানান, মাছ ধরার ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে সেলাই কাজ বড় সহায়ক হতে পারে। তিনি বলেন, “নিজেদের কাপড় তৈরি ছাড়াও অন্যদের কাজ করে আয় করা সম্ভব হবে।”
আরেক জেলে প্রদীপ জলদাশের ভাষায় উঠে আসে অনিশ্চয়তার বাস্তবতা। তিনি বলেন, মাছ না ধরতে পারলে অনেক সময় চাল কেনার টাকাও থাকে না। তবে এখন সেলাই মেশিন পাওয়ায় পরিবারের মেয়েরা আয়মূলক কাজে যুক্ত হতে পারবে বলে তিনি আশা করছেন।
জেলে বিধু বড়ুয়ার পরিবারেও একই চিত্র। তার মেয়ে তিন্নি বড়ুয়া সেলাই প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। পরিবারের সদস্যরা মনে করছেন, এই দক্ষতাই ভবিষ্যতে তাদের আর্থিক সংকট কমাতে ভূমিকা রাখতে পারে।
তার ভাই লিংকন বড়ুয়া বলেন, বাবার একার আয়ে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছিল। এখন বোন প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত হওয়ায় সেলাই মেশিন দিয়ে বাড়তি আয়ের সুযোগ তৈরি হবে।
জেলা প্রশাসনের এই উদ্যোগকে স্থানীয়ভাবে একটি “বিকল্প জীবিকা তৈরির পদক্ষেপ” হিসেবে দেখছেন অনেকে। একই সঙ্গে এটি হালদা পাড়ের জেলে পরিবারগুলোর মধ্যে স্বপ্ন দেখার নতুন সুযোগ তৈরি করেছে।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন এস. এম. রাহাতুল ইসলাম। আরও উপস্থিত ছিলেন মাসুম কবির, তোফাজ্জল হোসেন ফাহিম এবং মো. মনির হোছাইন।
স্থানীয়দের মতে, শুধু সেলাই মেশিন বিতরণ নয়—এই উদ্যোগ হালদা পাড়ের বহু জেলে পরিবারের জন্য নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দিয়েছে।