শিরোনাম
বোয়ালখালীতে স্মারক মেধা বৃত্তি পরীক্ষা: প্রবাসী ব্যবসায়ী সেলিম উদ্দিনকে ক্রেস্ট দিয়ে সংবর্ধনা চট্টগ্রামে শহীদ জিয়া-খালেদা জিয়া স্মৃতি আন্তঃস্কুল ফুটবল টুর্নামেন্ট শুরু বন্দরে দুই জাহাজের সংঘর্ষ, অক্ষত ৩৩ হাজার টন ডিজেল ভাটিয়ারীতে শিপইয়ার্ডে বিস্ফোরণ, নিহত ৪; আশঙ্কাজনক কয়েকজন ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফখরুলের মনোনয়ন গ্রহণ পদুয়া মাদরাসায় জিপিএ-৫ প্রাপ্তদের সংবর্ধনা চবিতে অনুষ্ঠিত হলো আন্তর্জাতিক এডুকেশন এক্সপো-২০২৬ চট্টগ্রামে মাসিক অপরাধ পর্যালোচনা সভা: অপরাধ দমনে কঠোর হওয়ার নির্দেশ সিএমপি কমিশনারের বন্যায় ক্ষতি, তবুও থেমে নেই কৃষক; আমন ও সবজি চাষে ব্যস্ত সাতকানিয়া ইউএস-বাংলাদেশ বিজনেস কাউন্সিলের ৫০ সদস্যের প্রতিনিধিদলের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক
শনিবার, ১৫ অগাস্ট ২০২৬, ০১:৪৬ অপরাহ্ন

পার্বত্য চট্টগ্রামে স্থায়ী শান্তি, নিরাপত্তা ও টেকসই উন্নয়নে সমন্বিত উদ্যোগের আহ্বান।

এরশাদ আলম বান্দরবান / ১২০ বার এই সংবাদটি পড়া হয়েছে
প্রকাশের সময় : বুধবার, ২২ জুলাই, ২০২৬

সংঘাতময় পার্বত্য চট্টগ্রামে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা, নিরাপত্তা জোরদার, সাম্প্রতিক বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলা, প্রাকৃতিক সম্পদের টেকসই ব্যবস্থাপনা এবং নাগরিক সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে বান্দরবানে অনুষ্ঠিত হয়েছে একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা সভা।

বুধবার (২২ জুলাই) সকালে বান্দরবান শহরের হিল ভিউ কনভেনশন হলে অনুষ্ঠিত এ সভায় বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার প্রতিনিধি, সাংবাদিক, গবেষক, রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ অংশ নেন। আলোচনায় অংশগ্রহণকারীরা অভিমত ব্যক্ত করেন যে, পার্বত্য চট্টগ্রামের দীর্ঘদিনের জটিল সমস্যার স্থায়ী সমাধান কেবল আইনশৃঙ্খলা রক্ষার মাধ্যমে নয়, বরং ন্যায়ভিত্তিক উন্নয়ন, জনগণের অংশগ্রহণ, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং পারস্পরিক আস্থার ভিত্তিতে একটি সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমেই সম্ভব।

দৈনিক দেশ বর্তমান, জাগো জনতা, হ্যালো বাংলা এবং দৈনিক বান্দরবান বার্তা যৌথভাবে এ আলোচনা সভার আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের মিডিয়া পার্টনার হিসেবে ছিল সকালের সময়, পার্বত্য বাণী, বার্তা টুডে, চ্যানেল সিএইচটি, চট্টগ্রাম সারাদিন, সময়ের নিউজ এবং নোঙর। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের এই যৌথ উদ্যোগকে অংশগ্রহণকারীরা জনসচেতনতা সৃষ্টির ক্ষেত্রে একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করেন।

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন দৈনিক দেশ বর্তমানের হেড অব নিউজ শাহরিয়ার হাসান। শুরুতেই বিশিষ্ট সাংবাদিক পারভেজ কামাল পার্বত্য চট্টগ্রামের শান্তি, নিরাপত্তা, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, সাম্প্রতিক বন্যা পরিস্থিতি, প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবস্থাপনা এবং নাগরিক অংশগ্রহণ নিয়ে একটি গবেষণাধর্মী প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। তিনি বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম শুধু ভৌগোলিক দিক থেকে নয়, পরিবেশগত ভারসাম্য, জাতীয় নিরাপত্তা, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা এবং অর্থনৈতিক সম্ভাবনার দিক থেকেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে দীর্ঘদিনের সংঘাত, ভূমি-সংক্রান্ত বিরোধ, জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত এবং উন্নয়ন বৈষম্যের কারণে এ অঞ্চলের সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগানো সম্ভব হচ্ছে না।

আলোচনা সভায় বক্তব্য রাখেন পার্বত্য চট্টগ্রাম ছাত্র পরিষদ, বান্দরবান জেলার সভাপতি আসিফ ইকবাল; পার্বত্য চট্টগ্রাম নাগরিক পরিষদ (পিসিএনপি) ও ইসলামী আন্দোলনের সভাপতি মৌলানা আবুল কালাম আজাদ; লামা প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক কামরুজ্জামান; বান্দরবান প্রেস ক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক সাংবাদিক মিনারুল হক; বান্দরবান জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক মুজিবুর রশিদ; অধ্যাপক ওসমান গনি; জসিম উদ্দিন তুষার; সিএইচটি সম্প্রীতি জোটের সভাপতি থোয়াইচিং চাক; বান্দরবান জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আবু জাফর; চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের সাংবাদিক ফারুক আবদুল্লাহ; লেখক, গবেষক ও সাংবাদিক এইচ. এম. ফারুক; বান্দরবান জেলা জামায়াতে ইসলামীর আমির মৌলভী আবদুস সালাম; মাটিরাঙ্গা থেকে আগত জালাল মিয়া এবং জাগো জনতার চেয়ারম্যান ও পার্বত্য চট্টগ্রাম নাগরিক পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির চেয়ারম্যান মো. কাজী মুজিবুর রহমান।

বক্তারা বলেন, বাংলাদেশের মোট ভূখণ্ডের প্রায় এক-দশমাংশ জুড়ে বিস্তৃত পার্বত্য চট্টগ্রাম দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল। এ অঞ্চল প্রাকৃতিক সম্পদ, বনজ সম্পদ, জীববৈচিত্র্য, পর্যটন এবং সীমান্ত নিরাপত্তার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও নানা কারণে এর উন্নয়ন কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় পৌঁছাতে পারেনি। তারা উল্লেখ করেন, দীর্ঘদিনের সংঘাত, অবিশ্বাস, ভূমি বিরোধ, উন্নয়নের অসম বণ্টন, জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগ এ অঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবিকা ও সামাজিক স্থিতিশীলতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

বক্তারা জোর দিয়ে বলেন, স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য সব পক্ষের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা সৃষ্টি, আইনের শাসন নিশ্চিতকরণ, ন্যায়ভিত্তিক উন্নয়ন এবং জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা অপরিহার্য। তাদের মতে, উন্নয়নের সুফল সকল জনগোষ্ঠীর কাছে সমানভাবে পৌঁছাতে হবে এবং রাষ্ট্রের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা আরও সুদৃঢ় করতে হবে।
নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনায় বক্তারা বলেন, পার্বত্য অঞ্চলে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অবৈধ অস্ত্রের বিস্তার রোধ, চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড দমন, সীমান্ত এলাকায় নজরদারি বৃদ্ধি এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয় প্রয়োজন। একই সঙ্গে সেনাবাহিনীর কার্যক্রম আরও বিস্তৃত করার মাধ্যমে স্থানীয় জনগণকে নিরাপত্তা ব্যবস্থার অংশীদার করার ওপরও গুরুত্বারোপ করা হয়। তাদের মতে, নিরাপত্তা ও উন্নয়ন একে অপরের পরিপূরক; একটি ছাড়া অন্যটি দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হতে পারে না।

সাম্প্রতিক সময়ে পার্বত্য অঞ্চলে টানা বর্ষণ, পাহাড়ি ঢল, বন্যা ও ভূমিধসের ফলে সৃষ্ট ক্ষয়ক্ষতির বিষয়টিও আলোচনায় গুরুত্বের সঙ্গে উঠে আসে। বক্তারা বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে এ ধরনের দুর্যোগের ঝুঁকি দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। তাই দুর্যোগ মোকাবিলায় শুধু তাৎক্ষণিক ত্রাণ কার্যক্রম নয়, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা জরুরি। তারা আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা আরও আধুনিক ও কার্যকর করা, পর্যাপ্ত আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ, নদী পুনঃখনন, জলাধার সংরক্ষণ, পাহাড় কাটা বন্ধ এবং জলবায়ু সহনশীল অবকাঠামো নির্মাণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। দৃশ্যমান বিভিন্ন ত্রাণ বিতরন ব্যবস্থা নিরাপত্তা বাহিনীর মাধ্যমে দেয়া হলে সুষ্ঠ বন্টন সম্ভব হবে।

প্রাকৃতিক সম্পদের টেকসই ব্যবস্থাপনা নিয়েও সভায় বিস্তারিত আলোচনা হয়। বক্তারা বলেন, বন উজাড়, অবৈধ পাহাড় কাটা, বালু ও পাথর উত্তোলন এবং নদী দূষণের মতো কর্মকাণ্ড শুধু পরিবেশের জন্যই নয়, মানুষের জীবন ও জীবিকার জন্যও হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। তারা সামাজিক বনায়ন সম্প্রসারণ, বন সংরক্ষণ আইন কার্যকর বাস্তবায়ন, পরিবেশ আদালতের কার্যকারিতা বৃদ্ধি এবং পরিবেশবান্ধব পর্যটনের প্রসারের সুপারিশ করেন। তাদের মতে, উন্নয়ন ও পরিবেশ সংরক্ষণের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা না করলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বড় ধরনের সংকট তৈরি হতে পারে।

বক্তারা আরও বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের উন্নয়নে নাগরিক সমাজের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শান্তি প্রতিষ্ঠা, মানবাধিকার সচেতনতা, পরিবেশ সংরক্ষণ, দুর্যোগে স্বেচ্ছাসেবী কার্যক্রম এবং সামাজিক সম্প্রীতি রক্ষায় নাগরিক সংগঠনগুলোকে আরও সক্রিয় হতে হবে। একই সঙ্গে তরুণ প্রজন্মকে শান্তি, সহনশীলতা, পরিবেশ সচেতনতা এবং সামাজিক দায়বদ্ধতার মূল্যবোধে উদ্বুদ্ধ করার ওপরও গুরুত্বারোপ করা হয়।

সভা থেকে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও কার্যকর ও শক্তিশালী করার আহ্বান জানানো হয়। বক্তারা বলেন, স্থানীয় জনগণের মতামতকে গুরুত্ব দিয়ে উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করলে তা অধিক গ্রহণযোগ্য ও টেকসই হবে। পাশাপাশি যুবসমাজের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দক্ষতা উন্নয়ন, শিক্ষা ও উদ্যোক্তা তৈরির উদ্যোগ বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়, যাতে তারা উন্নয়নের মূলধারায় যুক্ত হতে পারে।

গবেষণা ও তথ্যভিত্তিক নীতি প্রণয়নের ওপরও বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেন আলোচকরা। তাদের মতে, পার্বত্য অঞ্চলের বাস্তব পরিস্থিতি, পরিবেশগত ঝুঁকি, সামাজিক পরিবর্তন এবং অর্থনৈতিক সম্ভাবনা নিয়ে নিয়মিত গবেষণা পরিচালনা করা হলে নীতিনির্ধারণে তা কার্যকর ভূমিকা রাখবে। একই সঙ্গে সরকারি ও বেসরকারি সংস্থা, গবেষক, শিক্ষাবিদ এবং উন্নয়ন সহযোগীদের মধ্যে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণের প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরা হয়।

আলোচনা সভার সমাপনী বক্তব্যে বক্তারা আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে, রাষ্ট্র, স্থানীয় জনগণ, জনপ্রতিনিধি, গবেষক, সাংবাদিক, নাগরিক সমাজ এবং উন্নয়ন সহযোগীদের পারস্পরিক সহযোগিতা ও সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রামকে একটি শান্তিপূর্ণ, নিরাপদ, পরিবেশসম্মত এবং টেকসই উন্নয়নের অঞ্চলে পরিণত করা সম্ভব। তারা বলেন, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, সংলাপ, আইনের শাসন, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের ধারাবাহিক চর্চাই পারে পার্বত্য চট্টগ্রামের দীর্ঘদিনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে একটি সমৃদ্ধ ও স্থিতিশীল ভবিষ্যৎ নির্মাণের পথ সুগম করতে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই ক্যাটাগরির আরো সংবাদ