‘পরিচ্ছন্ন করি নগর-গ্রাম, গড়ি নান্দনিক চট্টগ্রাম’—এই স্লোগানকে সামনে রেখে চট্টগ্রামকে পরিচ্ছন্ন, স্বাস্থ্যসম্মত ও নান্দনিক জেলায় রূপ দেওয়ার লক্ষ্যে মাসব্যাপী পরিচ্ছন্নতা অভিযানের প্রথম দিনেই ১৩৫ টন বর্জ্য অপসারণ করেছে জেলা প্রশাসন। জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞার নেতৃত্বে শনিবার (২৫ জুলাই) জেলার সরকারি দপ্তর, সরকারি আবাসিক এলাকা, উপজেলা পর্যায়ের ভবন ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে একযোগে পরিচালিত এ অভিযানে প্রায় ৬ হাজার ২০০ কর্মকর্তা-কর্মচারী, শিক্ষার্থী, পরিবেশবাদী সংগঠনের প্রতিনিধি এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেন। জেলা প্রশাসনের দাবি, এক দিনে এত বিপুলসংখ্যক মানুষকে সম্পৃক্ত করে ১৩৫ টন বর্জ্য অপসারণের মধ্য দিয়ে বড় পরিসরের পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম পরিচালনার একটি নতুন রেকর্ড সৃষ্টি হয়েছে।

সকালে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউস প্রাঙ্গণ থেকে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রার মাধ্যমে মাসব্যাপী এ কর্মসূচির উদ্বোধন করা হয়। শোভাযাত্রাটি কাজীর দেউড়ি, চট্টগ্রাম অফিসার্স ক্লাব ও রেডিসন ব্লু এলাকা প্রদক্ষিণ করে পুনরায় সার্কিট হাউসে এসে শেষ হয়। পরে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়, কোর্ট হিল, আইনজীবী ভবন এবং জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের ছাদসহ বিভিন্ন স্থানে পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়।
জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, পরিচ্ছন্নতা অভিযানের আওতায় রয়েছে ১৩১টি সরকারি দপ্তরের ৪১৬টি ভবন, আটটি সরকারি আবাসিক এলাকার ১০৮টি ভবন, উপজেলা পর্যায়ের ৪০৬টি ভবন এবং ২ হাজার ২৯৫টি বিদ্যালয়। সব মিলিয়ে জেলার ৩ হাজার ২২৫টি ভবন ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে একযোগে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ শুরু হয়েছে। এসব ভবনের ছাদ, আঙিনা, ড্রেন ও আশপাশে জমে থাকা ময়লা-আবর্জনা অপসারণ করা হয়। প্রথম দিনের কার্যক্রমেই ১৩৫ টন বর্জ্য সংগ্রহ ও অপসারণ করা হয়েছে বলে জানিয়েছে জেলা প্রশাসন।
জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন, “আমরা কারও ওপর চাপ সৃষ্টি করে বা জোরপূর্বক এটি করাতে চাই না। আমরা পরিচ্ছন্নতাকে অভ্যাসে পরিণত করতে চাই।” তিনি বলেন, এই উদ্যোগের উদ্দেশ্য শুধু ময়লা-আবর্জনা পরিষ্কার করা নয়, বরং নাগরিকদের মধ্যে পরিচ্ছন্নতার স্থায়ী সংস্কৃতি গড়ে তোলা। একটি সুস্থ জাতি গড়তে সুস্থ পরিবেশের বিকল্প নেই উল্লেখ করে তিনি বলেন, “আমরা বিশ্বাস করি, সুস্থ চিন্তার জন্য সুস্থ শরীর ও সুস্থ মন প্রয়োজন। আর পরিবেশ যদি অস্বাস্থ্যকর হয়, তাহলে সুস্থ চিন্তা, সুস্থ শরীর ও সুস্থ মন—কোনোটিই সম্ভব নয়।”
আগামী প্রজন্মের জন্য স্বাস্থ্যকর পরিবেশ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করে জেলা প্রশাসক বলেন, প্রশাসনিক চাপ প্রয়োগ করে নয়, বরং মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের মাধ্যমে পরিচ্ছন্নতাকে দৈনন্দিন জীবনের অংশে পরিণত করাই এ কর্মসূচির লক্ষ্য। তিনি আরও বলেন, “আমরা একটি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন বাংলাদেশ চাই। বিশ্বমানচিত্রে বাংলাদেশের একটি সুস্থ পরিবেশ ও সুন্দর সমাজের চিত্র তুলে ধরতে আমরা কাজ করছি।”
জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, এ অভিযান শুধু উদ্বোধনী দিনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। মাসব্যাপী চলমান এ কর্মসূচির অংশ হিসেবে প্রতি শনিবার কোথা থেকে কতটুকু বর্জ্য অপসারণ করা হয়েছে, তার প্রতিবেদন সংগ্রহ করা হবে। পাশাপাশি পরিচ্ছন্নতার আগে ও পরের ছবি সংরক্ষণ করে কার্যক্রমের অগ্রগতি মূল্যায়ন করা হবে এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হবে।
উদ্বোধনী কর্মসূচি ও পরিচ্ছন্নতা অভিযানে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন, বিভাগীয় কমিশনার ড. মো. জিয়াউদ্দীন, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী বেলায়েত হোসেন, চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি (অতিরিক্ত আইজি পদে পদোন্নতিপ্রাপ্ত) মো. মনিরুজ্জামান, চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী, পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলমসহ বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, জনপ্রতিনিধি ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
জেলা প্রশাসনের মতে, প্রথম দিনের ব্যাপক সাড়া ও ১৩৫ টন বর্জ্য অপসারণের মাধ্যমে চট্টগ্রামকে পরিচ্ছন্ন, স্বাস্থ্যসম্মত ও নান্দনিক জেলায় রূপ দেওয়ার যে উদ্যোগ শুরু হয়েছে, তা মাসব্যাপী অব্যাহত থাকবে এবং এর মাধ্যমে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর পাশাপাশি সাধারণ মানুষের মধ্যেও পরিচ্ছন্নতা বিষয়ে সচেতনতা ও দায়িত্ববোধ আরও জোরদার হবে।